ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক সিলগালা

নতুন অতিথিকে ঘরে তোলার আনন্দ আর এক বুক আশা নিয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের একটি ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সী শিল্পী খাতুন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের মাতমে। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ওই প্রসূতি।
ঘটনাটি ঘটেছে কালীগঞ্জের ‘নিউ মডার্ন গরীব শাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ অভিযানে ক্লিনিকটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর জন্য তলব করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাষ্টভাঙা ইউনিয়নের সাতগাছিয়া গ্রামের ইয়ার আলীর স্ত্রী শিল্পী খাতুন সম্প্রতি ওই ক্লিনিকে ভর্তি হন। স্বজনদের দাবি, ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার সময় তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল। বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টও সন্তোষজনক ছিল বলে জানান তারা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সন্তান জন্মের পর মা ও নবজাতককে নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রত্যাশায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
তবে অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে অপারেশন কক্ষে নেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বজনদের কাছে তার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর পৌঁছায়। পরে তার মৃত্যু হয়।
শিল্পী খাতুনের স্বজনদের অভিযোগ, ক্লিনিকের কাগজপত্রে অ্যানেশথেসিয়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে ডা. তানভিরুল ইসলামের নাম উল্লেখ থাকলেও ঘটনার সময় তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন না। তাদের দাবি, চিকিৎসকদের ভুল সিদ্ধান্ত ও চরম অবহেলার কারণেই শিল্পী খাতুনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে ক্লিনিকটির মালিক ইসলাম হোসেনের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের অভিযোগ, তিনি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবা ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।
তবে প্রসূতির মৃত্যুর বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ওই ক্লিনিকের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ফাতিমা আক্তার। তিনি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, শিল্পী খাতুন উচ্চ রক্তচাপজনিত তীব্র জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটে।
প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ওঠা এসব অভিযোগের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে সোমবার সকালে উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ক্লিনিকটিতে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় সামনে আসার পর ‘নিউ মডার্ন গরীব শাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ সিলগালা করে দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. আমানুল্লাহ আল মামুন জানান, ক্লিনিকটিতে অনিয়ম এবং প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ক্লিনিকটি সিলগালা করার পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর জন্য তলব করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পর ক্লিনিকটির চিকিৎসাসেবা ও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।



