৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

যে তিন নারীর লড়াইয়ে বুয়েটে খুলেছিল নারীদের দরজা

Ohi’s – 21

আজ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। তবে এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস। প্রায় ছয় দশক আগে প্রকৌশল শিক্ষায় নারীদের প্রবেশের পথ সহজ ছিল না। ১৯৬৪ সালে তিন তরুণী সেই বাধার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের জন্য তো বটেই, পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্যও খুলে দিয়েছিলেন নতুন এক দরজা।

খালেদা শাহরিয়ার কবির, মনোয়ারা বেগম ও শিরীন সুলতানা—তিনজনেরই স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ইপুয়েট), যা আজকের বুয়েট। কিন্তু স্থাপত্য বিভাগ ছাড়া প্রকৌশলের অন্যান্য বিভাগে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়া হতো না।

খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা তখন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী, আর মনোয়ারা বেগম পড়তেন হলিক্রস কলেজে। প্রকৌশল পড়ার আগ্রহ থেকেই তারা ইপুয়েটে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতেই কর্তৃপক্ষ তাদের নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে পুরকৌশলকে নারীদের জন্য অনুপযুক্ত বলে মনে করা হতো।

এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, পুরকৌশলের শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয়। এমনকি সাভারে এক মাসের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পেও অংশ নিতে হতো। তৎকালীন রক্ষণশীল সামাজিক বাস্তবতায় মেয়েদের জন্য এমন পরিবেশ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মনে করত কর্তৃপক্ষ।

তবে তিন তরুণী সেই যুক্তি মেনে নেননি। তারা প্রশ্ন তোলেন, কোথাও তো বলা নেই যে মেয়েরা প্রকৌশল পড়তে পারবে না। অন্তত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তারা। শেষ পর্যন্ত তাদের দাবির কাছে কর্তৃপক্ষকে সম্মতি দিতে হয়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনজনই উত্তীর্ণ হন।

কিন্তু এরপরও বাধা পুরোপুরি কাটেনি। প্রথম বর্ষে সাধারণ প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনার পর দ্বিতীয় বর্ষে বিভাগ বেছে নেওয়ার সময় খালেদা ও শিরীন পুরকৌশল নিতে চাইলে আবার আপত্তি জানায় কর্তৃপক্ষ। সাভারের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পে অংশ নেওয়া নিয়ে ছিল মূল উদ্বেগ।

Advertisements

পরিবারের সম্মতি নিয়ে দুই তরুণী কর্তৃপক্ষকে বোঝান যে প্রয়োজন হলে তারাও সার্ভে ক্যাম্পে অংশ নিতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত তাদের পুরকৌশল পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। মনোয়ারা বেগম কেমিকৌশল বেছে নেন।

এভাবেই তিনজন হয়ে ওঠেন ইপুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষার্থী। তাদের নিয়ে তখন ক্যাম্পাসে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। অনেকেই তাদের দেখতে ও পরিচিত হতে আসতেন। পরে খালেদা শাহরিয়ার স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছিলেন, তাদের দেখতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত।

১৯৬৮ সালে খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। ওই বছর পুরকৌশল বিভাগের ১১৩ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ছিলেন এই দুই নারী। সমকালীন সংবাদপত্র Morning News তাদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং নারীদের জন্য নতুন একটি পেশার পথ উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে।

মনোয়ারা বেগম ১৯৭০ সালে কেমিকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

এরপর কর্মজীবনেও নতুন ইতিহাস তৈরি করেন খালেদা শাহরিয়ার। ১৯৬৯ সালে একটি প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন তিনি। পরের বছর যোগ দেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে, যা পরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে রূপ নেয়। সেখানেও তিনি পাকিস্তান সরকারের অধীনে নিয়োগ পাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রকৌশলী হন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন খালেদা শাহরিয়ার। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বও পান। তিস্তা ব্যারাজসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পানি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গেও তার কাজের সংশ্লিষ্টতা ছিল। ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি মারা যান।

ছয় দশক পর বুয়েটের ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন প্রকৌশল শিক্ষা ছিল মূলত পুরুষদের ক্ষেত্র। খালেদা, মনোয়ারা ও শিরীনের সাহস ও দৃঢ়তা শুধু তাদের নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করেনি, পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্যও প্রকৌশল শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিল।

Advertisements