৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

এআইয়ের তৈরি বন্যপ্রাণী ভিডিও: বিনোদনের ফাঁকে পরিবেশের বড় ক্ষ’তি

maxresdefault

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ এমন কোনো ভিডিও চোখে পড়ে, যা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও থামিয়ে দেয় আপনাকে। যেমন—মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, আর একটি মা পাখি নিজের ডানা মেলে ছানাদের আগলে রেখেছে। কিংবা কোনো বন্য প্রাণীকে দেখা যাচ্ছে মানুষের সঙ্গে অসম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে। দৃশ্যগুলো এতটাই আবেগঘন ও নিখুঁত যে সহজেই মনে হয়, প্রকৃতির ক্যামেরাবন্দি কোনো বিরল মুহূর্ত দেখছি।

কিন্তু একটু পর জানা গেল, পুরো দৃশ্যটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।
এমন ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমেই বাড়ছে। দেখতে সুন্দর, আবেগ জাগানো কিংবা বিস্ময়কর হওয়ায় এগুলো দ্রুত ভাইরালও হচ্ছে। কিন্তু এই প্রবণতাকে আর নিছক বিনোদন হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশঙ্কা, কৃত্রিমভাবে তৈরি বন্য প্রাণীর এসব দৃশ্য শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করছে না, বরং বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্যও তৈরি করতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।

প্রকৃতির গল্প যখন কৃত্রিম

জেনারেটিভ এআইয়ের সহজলভ্যতা বদলে দিয়েছে অনলাইন কনটেন্ট তৈরির ধরন। এখন কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই এমন ভিডিও বানানো সম্ভব, যেখানে বন্য প্রাণীদের এমন আচরণ করতে দেখা যায়, যা বাস্তবে হয়তো কখনোই ঘটেনি।সম্প্রতি Conservation Biology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব কর্ডোবার গবেষকেরা এআই-নির্মিত বন্য প্রাণীর ভিডিও নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এসব কনটেন্ট প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করছে।

ধরা যাক, কোনো ভিডিওতে একটি পাখিকে নিজের ডানা মেলে বৃষ্টির হাত থেকে ছানাদের রক্ষা করতে দেখা গেল। ক্যাপশনে লেখা হলো—‘মায়ের ভালোবাসা’। ভিডিওটি আবেগ তৈরি করলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নাও থাকতে পারে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৯০ শতাংশ পাখি প্রজাতির ক্ষেত্রে ছানা লালন-পালনে বাবা ও মা—দুজনেরই ভূমিকা থাকে। আবার সরীসৃপ, উভচর কিংবা মাছের বহু প্রজাতির মধ্যে সন্তান পালনের আচরণই দেখা যায় না। অর্থাৎ, এআই যখন নিজের মতো করে প্রাণীদের ‘গল্প’ বানিয়ে দেয়, তখন প্রকৃতির জটিল বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয় একটি কাল্পনিক ছবি।

শিকারি-শিকারের সম্পর্কেও বিভ্রান্তি

Advertisements

এআই-নির্মিত ভিডিওতে কখনো দেখা যায়, স্বাভাবিকভাবে পরস্পরের শিকারি ও শিকার এমন দুই প্রাণী পরম বন্ধুর মতো আচরণ করছে। কোথাও আবার পরজীবী ও তার আশ্রয়দাতা প্রাণীর মধ্যে তৈরি করা হচ্ছে অদ্ভুত এক ‘ভালোবাসার’ সম্পর্ক।

এসব দৃশ্য দেখতে মজার হলেও প্রাণীদের বাস্তব আচরণ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা কিংবা বন্য প্রাণী সম্পর্কে যাঁদের বৈজ্ঞানিক ধারণা কম, তাঁদের কাছে এসব কনটেন্টই হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি সম্পর্কে শেখার উৎস। সমস্যা হলো, একবার ভুল তথ্য জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটি সংশোধন করা অনেক কঠিন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন ও চমকপ্রদ কনটেন্ট সাধারণত তথ্যভিত্তিক কনটেন্টের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

‘বন্য প্রাণীও পোষা যায়’- এমন ভুল বার্তা

আরও বড় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বন্য প্রাণীকে ঘিরে তৈরি করা কৃত্রিম সখ্যের দৃশ্য নিয়ে। কোনো ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি হিংস্র প্রাণী মানুষের সঙ্গে খেলছে; কোথাও আবার মানুষকে দেখা যাচ্ছে বন্য প্রাণীকে আদর করতে।

বাস্তবে এমন প্রাণীর কাছাকাছি যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। কিন্তু এআই ভিডিও সেই ঝুঁকিকে আড়াল করে প্রাণীটির একটি ‘নিরাপদ’ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছবি তৈরি করছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে বন্য প্রাণীকে পোষা বা ব্যক্তিগতভাবে পালনের আগ্রহ বাড়তে পারে। পরোক্ষভাবে এটি বিদেশি পোষা প্রাণীর চাহিদা এবং অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্যকেও উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

সুন্দর প্রাণীর ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে অন্যরা

এআই কনটেন্টের আরেকটি সমস্যা হলো—এখানে সৌন্দর্য ও আকর্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে সিংহ, বাঘ, হাতি, হরিণ কিংবা নানা ধরনের পাখির মতো দেখতে আকর্ষণীয় প্রাণী বেশি জায়গা পাচ্ছে। বিপরীতে কম আকর্ষণীয় বা মানুষের কাছে কম পরিচিত প্রাণীরা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এর প্রভাব পড়তে পারে সংরক্ষণ কার্যক্রমেও। কোনো প্রাণী নিয়ে মানুষের আগ্রহ যত বেশি, তার জন্য অর্থায়ন ও জনসমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। তাই এআই যদি প্রকৃতির একটি বাছাই করা ও সৌন্দর্যনির্ভর ছবি মানুষের সামনে তুলে ধরে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম পরিচিত প্রজাতিগুলো সংরক্ষণে পিছিয়ে পড়তে পারে।

এমনকি ভুয়া ভূ-ট্যাগযুক্ত ভিডিওও বিপদ তৈরি করতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় একটি বিরল প্রাণী দেখা গেছে—এমন এআই ভিডিও দেখে পর্যটকেরা সেখানে ছুটে গেলে স্থানীয় পরিবেশের ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি হতে পারে।

গবেষণার তথ্যেও ঢুকছে এআই

বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। এআইয়ের প্রভাব পৌঁছে গেছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্যভান্ডারেও। Nature Ecology & Evolution সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নাগরিক-বিজ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে এআই-সম্পাদিত ছবি জমা পড়ার ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। একটি উদাহরণে দেখা যায়, ব্রাজিলে তোলা একটি পাখির ছবি ‘iNaturalist’ প্ল্যাটফর্মে এমনভাবে জমা পড়ে, যাতে সেটিকে উত্তর আমেরিকার ‘রেড-উইঙ্গড ব্ল্যাকবার্ড’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। অথচ পাখিটি ছিল ব্রাজিলের স্থানীয় ‘এপোলেট ওরিওল’।

ঘটনাটির পেছনে ছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছবিটির মান উন্নত করতে ব্যবহারকারী গুগলের এআই ইমেজ এডিটর ব্যবহার করেছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় এআই প্রশিক্ষণ ডেটার ওপর ভিত্তি করে ছবিতে ভুল বৈশিষ্ট্য যোগ করে দেয়। ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ছিল ছবিটি সুন্দর করা, প্রতারণা করা নয়। কিন্তু ফলাফল হিসেবে বৈজ্ঞানিক ডেটাবেসে ঢুকে পড়ে ভুল তথ্য। এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকলে নাগরিক-বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্মে জমা হওয়া বিপুল তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।

শুধু প্রকৃতি নয়, মানুষের মনেও প্রভাব

এআইয়ের তৈরি ‘নিখুঁত’ বাস্তবতা মানুষের দেখার অভ্যাসও বদলে দিচ্ছে। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক জেসিকা ম্যাডক্স এবং বিবিসির প্রযুক্তি সাংবাদিক থমাস জার্মেইনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কৃত্রিম কনটেন্টের অতিরিক্ত উপস্থিতি অনলাইন জগতের প্রতি মানুষের আস্থা ও মানবিক সংযোগকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি সত্যিকারের বিরল মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও আমাদের যে বিস্ময় ও আনন্দ দেয়, একই ধরনের দৃশ্য যখন অসংখ্যবার এআই দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়, তখন আসল-নকলের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সবকিছু নিয়েই সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে করণীয় কী?

এআইকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বন্য প্রাণীর ভিডিও বা ছবি দেখলে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার আগে উৎস যাচাই করতে হবে। কনটেন্টটি এআই দিয়ে তৈরি কি না, কোথায় ধারণ করা হয়েছে, এর সঙ্গে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা আছে কি না—এসব প্রশ্ন করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকেও এআই-নির্মিত কনটেন্টে স্পষ্ট লেবেল যুক্ত করতে হবে। নাগরিক-বিজ্ঞানভিত্তিক ডেটাবেসে ছবি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই-সম্পাদনার তথ্য জানানো বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গবেষক, সংরক্ষণকর্মী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে ভুল তথ্য দ্রুত শনাক্ত ও সংশোধন করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রকৃতির প্রতি আমাদের কৌতূহল যেন কৃত্রিম গল্পের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। বন্য প্রাণীকে ভালোবাসার অর্থ তাদের মানুষের মতো আচরণ করানো নয়; বরং তাদের স্বাভাবিক জীবন, আচরণ ও আবাসস্থলকে সম্মান করা।

Advertisements