বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জীবনযাপন

এক টুকরো আনারসেই এত উপকার! জেনে নিন ৮ কারণ

pineapple

রসালো, সুস্বাদু এবং হালকা টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে আনারস অনেকেরই পছন্দের ফল। গরমের দিনে এক টুকরো ঠান্ডা আনারস যেমন প্রশান্তি দিতে পারে, তেমনি নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এই ফল খেলে শরীরও পেতে পারে নানা ধরনের পুষ্টি।

আনারসে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। বিশেষ করে ভিটামিন সি ও ম্যাঙ্গানিজের ভালো উৎস হিসেবে ফলটি বেশ পরিচিত। পাশাপাশি এতে থাকা ব্রোমেলেইন নামের এনজাইম হজমপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।

Slices of fresh pineapple on wooden table

সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে আনারস খেলে হজমশক্তি থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বকের স্বাস্থ্যসহ শরীরের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকার মিলতে পারে। আনারসের উল্লেখযোগ্য ৮টি স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরা হলো—

১. প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের জোগান দেয়

আনারসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। এক কাপ আনারস থেকে দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় ৮৮ শতাংশ ভিটামিন সি এবং ১০৯ শতাংশ ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া যেতে পারে।

ভিটামিন সি শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ম্যাঙ্গানিজ হাড়ের স্বাস্থ্য ও শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। এ ছাড়া আনারসে খাদ্য আঁশ, পটাসিয়াম ও ক্যালসিয়ামও রয়েছে।

‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত গবেষণাতেও আনারসে এসব পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

Advertisements

২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভালো উৎস

শরীরে উৎপন্ন ফ্রি র‍্যাডিকেলের কারণে কোষে যে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আনারসে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনল উল্লেখযোগ্য।

শরীরে ফ্রি র‍্যাডিকেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভারসাম্য নষ্ট হলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।

‘নিউট্রিশন অ্যান্ড মেটাবলিজম’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় আনারস খাওয়ার সঙ্গে হৃদপিণ্ডের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

৩. হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে

আনারস হজমের জন্যও উপকারী হতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো এতে থাকা ব্রোমেলেইন নামের একটি এনজাইম। এই এনজাইম প্রোটিন ভাঙার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে, ফলে খাবার হজমে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

আনারসে থাকা খাদ্য আঁশও পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। এ কারণে পরিমিত পরিমাণে আনারস সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হতে পারে।

৪. কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক

যাদের নিয়মিত কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে, তাদের খাদ্যতালিকায় আঁশসমৃদ্ধ ফল রাখা উপকারী হতে পারে। আনারসে থাকা খাদ্য আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করে।

‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে আনারসের সম্ভাব্য উপকারিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু আনারসের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত পানি পান ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়াও জরুরি।

৫. ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে

আনারসে থাকা ব্রোমেলেইন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় এর সম্ভাব্য ক্যান্সারবিরোধী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে।

শরীরে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আনারসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ব্রোমেলেইন এ ক্ষেত্রে কিছুটা সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে।

তবে আনারসকে ক্যান্সারের চিকিৎসা বা নিশ্চিত প্রতিরোধের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। এটি বরং স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে উপকারী হতে পারে।

৬. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালো রাখতে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব রয়েছে। আনারসে প্রচুর ভিটামিন সি থাকায় এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।

এ ছাড়া আনারসে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে আনারস খাওয়া সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

৭. ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে

আনারসে থাকা ব্রোমেলেইনের প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে। শরীরে প্রদাহ কমাতে পারলে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা ও অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।

‘ফুডস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আর্থ্রাইটিসজনিত ব্যথা উপশমে আনারসের সম্ভাব্য উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে অস্টিওআর্থারাইটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত কোমরব্যথা কমাতেও এটি সহায়ক হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পিরিয়ডের সময় হওয়া ব্যথা কমাতেও আনারস উপকারী হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৮. ত্বককে রাখতে পারে স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল

ত্বকের যত্নেও আনারসের ভূমিকা থাকতে পারে। এতে থাকা ভিটামিন সি শরীরে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোলাজেন ত্বকের গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয়।

এ ছাড়া আনারসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি র‍্যাডিকেলের কারণে সৃষ্ট কোষীয় ক্ষতি কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় আনারসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের সঙ্গে ত্বকের ক্ষতি কমানো, ত্বকের গঠন উন্নত করা এবং বলিরেখা কমানোর সম্ভাব্য সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে।

তাই শুধু বাহ্যিক প্রসাধনীর ওপর নির্ভর না করে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফলমূল খাদ্যতালিকায় রাখাও ত্বকের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিমিত আনারসই ভালো

আনারস নিঃসন্দেহে পুষ্টিকর একটি ফল। তবে যেকোনো খাবারের মতো এটিও পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত আনারস খেলে এর টকভাব বা অ্যাসিডিটির কারণে কারও কারও মুখ, জিহ্বা বা পেটে অস্বস্তি হতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হয় তাজা আনারস খেলে। অতিরিক্ত চিনি মেশানো আনারসের জুস বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে তাজা ফল বেছে নেওয়া তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর। আর কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা, খাদ্য-অসহিষ্ণুতা বা চিকিৎসাজনিত বিধিনিষেধ থাকলে খাদ্যতালিকায় নিয়মিত আনারস যোগ করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুস্বাদু এই ফলটি তাই শুধু জিভের স্বাদ মেটানোর জন্য নয়, বরং সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবেও রাখতে পারেন। ভিটামিন সি, খাদ্য আঁশ, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমন্বয়ে আনারস শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় সহায়ক একটি ফল হতে পারে।

Advertisements