বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জীবনযাপন

সন্তানকে শাসন নয়, বোঝাপড়ায় বড় করার নতুন কৌশল ‘টাইপ সি প্যারেন্টিং’

5ed438d6-8c43-4702-ad6d-334b3b946803

সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অভিভাবকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে সন্তান পালনের পদ্ধতি নিয়ে সময়ের সঙ্গে বদলেছে দৃষ্টিভঙ্গি। একসময় কড়া শাসন, কঠোর নিয়ম এবং পড়াশোনায় ভালো ফল করাকেই ভালো অভিভাবকত্বের অন্যতম মাপকাঠি মনে করা হতো। এখন সেই ধারণায় এসেছে পরিবর্তন। সন্তানের মানসিক সুস্থতা, আবেগ বোঝার ক্ষমতা এবং নিজের কথা প্রকাশের স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক।

এই পরিবর্তিত ভাবনার সঙ্গে আলোচনায় এসেছে ‘টাইপ সি প্যারেন্টিং’। এ পদ্ধতিতে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে তার সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি, মন দিয়ে কথা শোনা এবং আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুকে কোনো নিয়মের মধ্যে রাখা হবে না। বরং ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।

আগে জানা যাক টাইপ এ ও টাইপ বি প্যারেন্টিং

টাইপ সি প্যারেন্টিংয়ের ধারণাটি বুঝতে হলে টাইপ এ ও টাইপ বি প্যারেন্টিং সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা থাকা দরকার।

টাইপ এ প্যারেন্টিংয়ে অভিভাবকেরা সাধারণত কঠোর নিয়ম ও নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলতে পছন্দ করেন। সন্তান কী করবে, কখন পড়বে, কখন খেলবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকে। সন্তানকে সফল ও নিখুঁত করে তোলার তাগিদও এখানে প্রবল হতে পারে।

অন্যদিকে টাইপ বি প্যারেন্টিং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শিথিল। এখানে নির্দিষ্ট রুটিন বা নিয়মের ওপর খুব বেশি জোর দেওয়া হয় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী সন্তানকে নিজের মতো করে চলার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে একদিকে যেমন শিশুর স্বাধীনতা বেশি থাকে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাঠামো বা সীমারেখার ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

Advertisements

মাঝামাঝি ভারসাম্যের জায়গা টাইপ সি

টাইপ সি প্যারেন্টিংকে অনেকটা এই দুই পদ্ধতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। এখানে সন্তানকে নিয়মের মধ্যে রাখা হয়, কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে সেই নিয়মকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিভাবকেরা নমনীয় হন এবং সন্তানের বয়স, পরিস্থিতি ও মানসিক অবস্থাকে বিবেচনায় নেন।

এই পদ্ধতির সঙ্গে ‘গুড-এনাফ প্যারেন্টিং’ বা ‘যথেষ্ট ভালো অভিভাবকত্ব’-এর ধারণার মিল রয়েছে। অর্থাৎ সন্তানের জন্য নিখুঁত অভিভাবক হওয়ার চাপ না নিয়ে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী যথাসম্ভব সহায়ক ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

টাইপ সি প্যারেন্টিংয়ে সন্তানকে শুধু নির্দেশ দেওয়ার বদলে তার সঙ্গে কথা বলা হয়। সে কেন কোনো কাজ করেছে, কেন মন খারাপ করেছে বা কেন কোনো বিষয়ে আপত্তি করছে—এসব বোঝার চেষ্টা করা হয়। ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা বা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভুলের কারণ খুঁজে বের করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘সি’ দিয়ে কী বোঝানো হয়?

টাইপ সি প্যারেন্টিংয়ের আলোচনায় ‘C’ অক্ষরটি সাধারণত তিনটি ধারণার সঙ্গে যুক্ত—Connection, Communication এবং Compassion।

Connection বা সংযোগ: সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সে নিরাপদ ও আপন মনে করে নিজের কথা বলতে পারে।

Communication বা যোগাযোগ: শুধু সন্তানকে নির্দেশ না দিয়ে তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং তার মতামত শোনা।

Compassion বা সহানুভূতি: শিশুর আবেগ, ভয়, হতাশা কিংবা রাগকে অবহেলা না করে তার অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা।

এই তিনটি বিষয় শিশুর আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও আত্মবিশ্বাস বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কীভাবে চর্চা করবেন টাইপ সি প্যারেন্টিং?

মনোযোগ দিয়ে সন্তানের কথা শুনুন

সন্তান কোনো কথা বলতে এলে শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, বোঝার জন্য শুনুন। সে স্কুলে কী করেছে, বন্ধুর সঙ্গে কী হয়েছে কিংবা কোনো বিষয়ে কেন মন খারাপ—এসব কথা বলার সময় ফোন বা অন্য কাজ কিছুক্ষণের জন্য পাশে রেখে তাকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

আবেগকে অস্বীকার করবেন না

শিশু কাঁদলে ‘কেঁদো না’, ভয় পেলে ‘ভয় পাওয়ার কী আছে’ কিংবা রেগে গেলে ‘রাগ করা যাবে না’—এ ধরনের কথা তার অনুভূতিকে আরও চেপে রাখতে শেখাতে পারে। বরং বলা যেতে পারে, ‘তোমার খারাপ লাগছে, আমি সেটা বুঝতে পারছি। চলো, দেখি কীভাবে সমস্যাটা সমাধান করা যায়।’

সীমারেখা রাখুন, তবে নমনীয় থাকুন

টাইপ সি প্যারেন্টিং মানে সন্তানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া নয়। বরং তার নিরাপত্তা, বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা জরুরি। তবে কোনো নিয়ম ভাঙলে শুধু শাস্তি না দিয়ে, কেন নিয়মটি প্রয়োজন এবং এর ফলে কী হতে পারে—তা বুঝিয়ে বলা উচিত। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মে সামান্য পরিবর্তন আনা যেতে পারে, কিন্তু অভিভাবকের অবস্থান যেন ধারাবাহিক ও যুক্তিসংগত থাকে।

ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখুন

শিশু ভুল করবেই। ভুলের জন্য অপমান বা ভয় দেখানোর বদলে তাকে ভাবতে সাহায্য করুন—কী ভুল হয়েছে, কেন হয়েছে এবং পরেরবার কীভাবে তা এড়ানো যায়। এতে শিশুর মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হবে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবার ক্ষমতা বাড়বে।

নিজের আচরণে উদাহরণ তৈরি করুন

শিশু অভিভাবকের কথা শোনার পাশাপাশি তাঁদের আচরণও অনুসরণ করে। তাই রাগের সময় কীভাবে কথা বলতে হয়, মতের অমিল হলে কীভাবে আলোচনা করতে হয় কিংবা ভুল হলে কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়—এসব আচরণ অভিভাবকেরাই আগে দেখাতে পারেন।

টাইপ সি প্যারেন্টিং কোনো কঠোর সূত্র নয়; বরং সন্তানকে বোঝা, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশ দেওয়ার একটি সচেতন পদ্ধতি। প্রতিটি শিশুর স্বভাব ও প্রয়োজন আলাদা। তাই অন্যের পদ্ধতি হুবহু অনুসরণ না করে নিজের সন্তানের বয়স, ব্যক্তিত্ব ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভালোবাসা, যোগাযোগ ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements