বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

ফ্রেন্ডলিস্টে হাজার নাম, তবু মন খুলে বলার মানুষ কয়জন?

WhatsApp Image 2026-08-30 at 12.10.53 PM

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই চোখে পড়ে পরিচিত মানুষের ভিড়। কারও ফ্রেন্ডলিস্টে পাঁচশ, কারও হাজার, আবার কারও কয়েক হাজার মানুষ। জন্মদিনে শুভেচ্ছার বন্যা, ছবিতে অসংখ্য লাইক-কমেন্ট, স্টোরিতে রিঅ্যাকশন—সব মিলিয়ে মনে হতে পারে, মানুষটি বুঝি ভীষণ সামাজিক, চারপাশে তার কত মানুষ!
কিন্তু এই বিশাল তালিকার মানুষগুলোর মধ্যে রাত গভীরে মন খারাপ হলে কাকে ফোন করা যায়? ব্যর্থতার কথা নির্দ্বিধায় কাকে বলা যায়? নিজের ভয়, অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা এমন কোনো কথা—যা কাউকে বলা যায় না—সেটি বলার মতো মানুষই বা কয়জন?

বাস্তবতা হলো, অনলাইনে পরিচিত মানুষের সংখ্যা আর জীবনে সত্যিকারের কাছের মানুষের সংখ্যা এক নয়।
পরিচিতি যত বাড়ে, ঘনিষ্ঠতা কি তত বাড়ে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বহু বছর দেখা নেই এমন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় মুহূর্তেই। দূরে থাকা আত্মীয়ের জীবনযাত্রার খবর জানা যায়। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ও হয় খুব সহজে।

কিন্তু যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতা এক বিষয় নয়।

কারও পোস্টে নিয়মিত লাইক দেওয়া মানেই তার জীবনের গল্প জানা নয়। প্রতিদিন স্টোরি দেখা মানেই তার অনুভূতি বোঝা নয়। এমনকি প্রতিদিন চ্যাট করলেও একজন মানুষকে গভীরভাবে জানা সম্ভব নাও হতে পারে।
কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্ব তৈরি হয় শুধু কথোপকথনে নয়; তৈরি হয় বিশ্বাস, নিরাপত্তা, বোঝাপড়া এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে।

সব কথা সবাইকে বলা যায় না

মানুষের জীবনে এমন কিছু অনুভূতি থাকে, যা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাসিমুখের ছবির আড়ালে থাকতে পারে হতাশা, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্ট, ক্যারিয়ার নিয়ে ভয়, পরিবারের চাপ কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
এসব কথা বলার জন্য দরকার এমন একজন, যার সামনে নিজেকে ‘পারফেক্ট’ প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
যার কাছে কান্না করলে লজ্জা লাগে না। দুর্বলতার কথা বললে বিচার করার ভয় থাকে না।

Advertisements

ভুল স্বীকার করলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

এই মানুষটিই হয়তো আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু—যদিও ফ্রেন্ডলিস্টে তার নামের পাশে কোনো বিশেষ চিহ্ন নেই।
কেন এমন হয়? এর একটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা নিজেদের জীবনের বাছাই করা অংশই দেখাই। আনন্দের মুহূর্ত, সাফল্য, সুন্দর ছবি, ভ্রমণ, উদযাপন—এসব সহজেই প্রকাশ করি। কিন্তু ভেতরের দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা কিংবা ভঙ্গুর মুহূর্তগুলো অনেক সময় আড়ালেই থাকে। ফলে আমরা একে অন্যের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অনেক সময় একে অন্যের বাস্তব জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানি। আরেকটি বিষয় হলো, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা। পড়াশোনা, চাকরি, ক্যারিয়ার, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সবকিছুর চাপে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বন্ধুত্বের সংখ্যা হয়তো অনেক থাকে, কিন্তু গভীর সম্পর্কের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসে।

‘অনলাইন’ থাকা মানেই পাশে থাকা নয়

কাউকে অনলাইনে সবসময় পাওয়া যাচ্ছে—এটা আর তাকে মানসিকভাবে পাশে পাওয়া এক বিষয় নয়।
আপনি হয়তো রাত দুইটায় কাউকে মেসেজ করলেন। সে অনলাইনে থেকেও উত্তর দিল না। আবার এমনও হতে পারে, বহুদিন কথা হয়নি এমন একজন আপনার কষ্টের কথা শুনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশে থাকল। সেখানেই বোঝা যায়—কাছের মানুষ চেনার জন্য যোগাযোগের ঘনত্বের চেয়ে সম্পর্কের গভীরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো বছরের পর বছর কথা না বলেও কোনো একজন মানুষ আমাদের কাছে নিরাপদ জায়গা হয়ে থাকতে পারেন। আবার প্রতিদিন কথা বলা কোনো মানুষও হয়তো আমাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত কথাগুলোর যোগ্য নন।

সত্যিকারের বন্ধুত্বের কিছু নীরব লক্ষণ

কাছের মানুষ সবসময় আপনার সঙ্গে একমত হবেন—এমন নয়। বরং সত্যিকারের বন্ধু প্রয়োজন হলে আপনার ভুলটাও ধরিয়ে দিতে পারেন। তিনি আপনার সাফল্যে ঈর্ষার বদলে আনন্দিত হন। আপনার ব্যর্থতায় ‘আমি তো বলেছিলাম’ না বলে পাশে দাঁড়ান। আপনার ব্যক্তিগত কথা অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেন না। আপনি যখন কথা বলতে চান, তখন শুধু নিজের কথা বলার অপেক্ষায় না থেকে মন দিয়ে শোনেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তার সামনে আপনাকে অভিনয় করতে হয় না।

কারণ সত্যিকারের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো, সেখানে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয় না। তাহলে কি অনেক বন্ধু থাকা খারাপ? একদমই নয়। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নতুন সম্পর্ক তৈরি, সামাজিক পরিসর বাড়ানো—সবই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনেক পরিচিত মানুষ থাকা আনন্দেরও হতে পারে। তবে সমস্যা তখনই, যখন ফ্রেন্ডলিস্টের সংখ্যা দিয়ে নিজের সামাজিক মূল্য কিংবা সম্পর্কের গভীরতা মাপতে শুরু করি। হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও যদি নিজের কষ্ট বলার মতো একজন মানুষ না থাকে, তাহলে হয়তো সংখ্যার দিকে নয়, সম্পর্কের মানের দিকে তাকানোর সময় এসেছে।

শেষ পর্যন্ত কয়জন থাকে?

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বন্ধুত্বের তালিকা বদলায়। স্কুলের বন্ধু দূরে চলে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক বদলে যায়। কেউ কেউ হঠাৎ করেই জীবনের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত হয়তো হাতে গোনা কয়েকজনই থেকে যায়।
কিন্তু সেই কয়েকজনই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনে কতজন মানুষ আপনার ছবি দেখেছে, কতজন লাইক দিয়েছে কিংবা কতজন জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছে—তা হয়তো সময়ের সঙ্গে ভুলে যাবেন।

কিন্তু মনে থাকবে সেই মানুষটির কথা, যে আপনার খারাপ সময়ে ফোন কেটে দেয়নি। যে আপনার নীরবতাও বুঝেছে। যে আপনার সাফল্যের দিনে যেমন পাশে ছিল, ব্যর্থতার রাতেও তেমনই ছিল। তাই ফ্রেন্ডলিস্টে হাজার নাম থাকা নিশ্চয়ই আনন্দের। তবে তার চেয়েও বড় পাওয়া হলো—সেই তালিকার ভিড়ে দু-একজন এমন মানুষ থাকা, যাদের কাছে নিজের মনটা নিঃসংকোচে খুলে বলা যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রয়োজন হাজার পরিচিত মুখ নয়; প্রয়োজন কয়েকটি নিরাপদ সম্পর্ক, যেখানে আমরা নিঃসংকোচে বলতে পারি—‘আজ আমার মনটা ভালো নেই।’

Advertisements