বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

নেপালে ওষুধ-পানির তীব্র সংকট

sa_124.1788009409

নেপালে ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, যানবাহন ও জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়ে হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন শিবিরে। কিন্তু বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরও তাদের দুর্ভোগ কমেনি। বরং সামনে এসেছে নতুন এক সংকট—প্রয়োজনীয় ওষুধ, নিরাপদ পানি, খাবার ও চিকিৎসাসেবার অভাব।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভরশীল রোগীরা। নুয়াকোটের ত্রিশূলী এলাকার বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাইনের জীবনই তার একটি উদাহরণ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যার কারণে তাকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। কিন্তু ভয়াবহ বন্যায় তার বাড়ি ও চারটি দোকান ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। সঙ্গে থাকা ওষুধও রক্ষা করতে পারেননি তিনি।

এখন পরিবারের সঙ্গে ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছের একটি আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে তার। কিন্তু সেখানেও মিলছে না প্রয়োজনীয় ওষুধ। রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীরের ভাষ্য, টানা তিন দিন মাকে ওষুধ খাওয়াতে পারেননি তারা। বন্যার পর বেঁচে থাকা যেন তাদের জন্য নতুন এক অনিশ্চয়তার শুরু।

জরুরি চিকিৎসাতেও ভোগান্তি

শুধু দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের নয়, জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আশ্রয়শিবিরে থাকা রঘুবীরের বোনের শ্বশুরবাড়ির এক নারী হঠাৎ প্রসববেদনায় আক্রান্ত হলে তাকে ত্রিশূলী হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তার প্রসব করানো সম্ভব হয়নি। এদিকে বন্যায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কাঠমান্ডুতে নেওয়ার পথও বন্ধ ছিল। শেষ পর্যন্ত বহু অনুরোধের পর শনিবার সকালে হেলিকপ্টারে করে ওই নারীকে কাঠমান্ডুর পারোপকার মাতৃ ও নারী হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এই ঘটনা শুধু একজন প্রসূতির দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি বন্যায় ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় গুরুতর রোগীদের এখন অনেক ক্ষেত্রেই আকাশপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় হেলিকপ্টারও সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না।

Advertisements

হাসপাতালেই কমছে ওষুধের মজুত

বন্যার প্রভাব পড়েছে ত্রিশূলী হাসপাতালের ওষুধের ভাণ্ডারেও। প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত দ্রুত কমে আসছে। হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানিয়েছেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত দেওয়া হয় এমন কিছু ওষুধ, যার মধ্যে অ্যাটেনোলল ও লোসার্টান রয়েছে, এখন পাওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, আশপাশের আশ্রয়শিবিরগুলোতে থাকা অনেক মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে। অথচ বন্যার কারণে তারা নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সংগ্রহ করতে পারছেন না।

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় হাসপাতালের স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচিও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে ওষুধের সংকট, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে দুর্যোগকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

পানির সংকট, বাড়ছে রোগের ভয়

বন্যার পানিতে ত্রিশূলী হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকার নিরাপদ পানির প্রধান উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি খাল থেকে আগে স্থানীয়রা পানি সংগ্রহ করতেন। বন্যার স্রোতে সেই খাল ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে একটি পানির পাইপলাইনও ভেসে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।

হাসপাতালের আশপাশে তিনটি আশ্রয়শিবিরে প্রায় এক হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। ভৈরুং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি আচ্ছাদিত হল ও বেথান একাডেমিতে ঠাঁই নেওয়া এসব মানুষের মধ্যে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা, শিশু ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষ। কিন্তু এত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। ফলে বন্যার পর পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

ত্রিশূলী হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক রাজেন্দ্র লামার মতে, এত মানুষ যখন সীমিত জায়গায় একসঙ্গে বসবাস করছেন, তখন রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিরাপদ পানির অভাব এবং পর্যাপ্ত শৌচাগার না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।


খাবারেও নেই স্বস্তি

আশ্রয়শিবিরে থাকা দুর্গতদের আরেকটি অভিযোগ খাবার নিয়ে। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে তাদের মধ্যে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। দুর্যোগের সময় শুধু খাবার পেলেই মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। দীর্ঘমেয়াদি রোগী, শিশু ও প্রসূতিদের জন্য প্রয়োজন আলাদা ধরনের খাদ্য ও পর্যাপ্ত পুষ্টি। কিন্তু বন্যার পর ভেঙে পড়া সরবরাহব্যবস্থায় সেটিও কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা

বন্যায় শুধু অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থাই ভেঙে পড়েনি, দেখা দিয়েছে নিরাপত্তা সংকটও। হাসপাতাল এলাকায় বর্তমানে মাত্র সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন রাজেন্দ্র লামা। তার দাবি, দিনের বেলাতেও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও নিরাপত্তাকর্মী প্রয়োজন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মুখোশ পরা চার-পাঁচজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে এসে চিকিৎসকদের একটি অস্ত্রোপচার থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। পরে আশপাশের বাড়িঘরেও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। এই সুযোগে কালোবাজারির অভিযোগও উঠেছে।

নেপালের বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য তাই উদ্ধার অভিযান শেষ করাই এখন যথেষ্ট নয়। বন্যার পরের এই দ্বিতীয় ধাক্কা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ওষুধ, নিরাপদ পানি, পুষ্টিকর খাবার, জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ দুর্যোগের পানি হয়তো নেমে যাচ্ছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক সংকট এখনো কাটেনি।

Advertisements