সমুদ্রপাড়ে বেড়াতে যাচ্ছেন?নোনাজল আর রোদ থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে

সমুদ্রের নীল জল, মৃদু ঢেউ আর খোলা আকাশ- ছুটি কাটানোর জন্য সমুদ্রসৈকতের চেয়ে মন ভালো করা জায়গা খুব কমই আছে। কিন্তু আনন্দের এই ভ্রমণ শেষে অনেকেরই দেখা দেয় ত্বকের নানা সমস্যা। অতিরিক্ত রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়া, কালচে হয়ে যাওয়া, শুষ্কতা, লালচে ভাব কিংবা ঠোঁট ফেটে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সমুদ্রের নোনা জল, বালু, বাতাস এবং দীর্ঘ সময়ের সূর্যরশ্মি- সব মিলিয়ে ত্বকের ওপর তৈরি হয় বাড়তি চাপ। তাই সমুদ্রভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি ত্বকের যত্নেও রাখতে হবে বাড়তি নজর। ভ্রমণের আগে, সৈকতে অবস্থানের সময় এবং বাড়ি ফেরার পর কয়েকটি অভ্যাস মেনে চললেই অনেকটা কমানো যায় ক্ষয়ক্ষতি।
যাওয়ার আগেই ত্বককে প্রস্তুত করুন
সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার অন্তত ২০–৩০ মিনিট আগে ত্বকের খোলা অংশে এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন লাগানো ভালো। শুধু মুখ নয়, ঘাড়, কান, হাত, পায়ের পাতা ও অন্যান্য খোলা অংশেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে নিয়মিত পুনরায় লাগানোর বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
যাঁদের ত্বক সংবেদনশীল, তাঁরা জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডযুক্ত মিনারেল সানস্ক্রিন বেছে নিতে পারেন। নতুন কোনো প্রসাধনী ব্যবহারের আগে ত্বকে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়াও ভালো। শুধু সানস্ক্রিন যথেষ্ট নয়। চওড়া কিনারার টুপি, ইউভি সুরক্ষাযুক্ত সানগ্লাস এবং শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখে- এমন হালকা পোশাক ব্যবহার করুন। ঠোঁটের জন্যও এসপিএফযুক্ত লিপবাম সঙ্গে রাখুন।
সৈকতে গিয়ে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
সৈকতে দীর্ঘ সময় রোদে থাকার কারণে সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা কমে যায়। তাই সাধারণভাবে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এবং সাঁতার বা অতিরিক্ত ঘামের পর সানস্ক্রিন পুনরায় ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সম্ভব হলে দিনের সবচেয়ে তীব্র রোদ, বিশেষ করে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে, সরাসরি রোদে থাকার সময় কমিয়ে দিন। ছাতা, টুপি কিংবা ছায়াযুক্ত জায়গার আশ্রয় নিতে পারেন। সমুদ্রের বাতাস ও প্রচণ্ড গরমে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। তাই সঙ্গে পানির বোতল রাখুন এবং নিয়মিত পানি পান করুন। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি ও পানিসমৃদ্ধ ফলও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
হোটেলে ফিরেই ত্বকের যত্ন
সৈকত থেকে হোটেলে ফিরে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ত্বক পরিষ্কার করা। মেকআপ বা ভারী সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে প্রয়োজন অনুযায়ী মৃদু ক্লিনজার দিয়ে তা পরিষ্কার করে এরপর কোমল ফেসওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ত্বক অতিরিক্ত ঘষাঘষি করা যাবে না। সমুদ্রের নোনা জল ও রোদের কারণে ত্বক তখন এমনিতেই সংবেদনশীল থাকতে পারে। ত্বকে রোদে পোড়া বা জ্বালাপোড়া থাকলে সুগন্ধিবিহীন অ্যালোভেরা জেল বা মৃদু ময়শ্চারাইজার আরাম দিতে পারে। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে হায়ালুরনিক অ্যাসিড বা সেরামাইডযুক্ত ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাড়ি ফেরার পরও চলুক যত্ন
ভ্রমণ শেষ হলেই ত্বকের যত্ন শেষ নয়। বাড়ি ফেরার পর কয়েক দিন ত্বককে বিশ্রাম দেওয়াই ভালো। রোদে পোড়া ত্বকে ঠান্ডা পানিতে ভেজানো নরম কাপড় দিয়ে সেঁক দেওয়া যেতে পারে। অ্যালোভেরা জেলও আরাম দিতে পারে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকে ঘষা কিংবা ত্বক খসখসে করে তোলার মতো স্ক্রাব ব্যবহার করা উচিত নয়। ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে হালকা ভেজা ত্বকে ময়শ্চারাইজার লাগানো উপকারী। শরীরের ত্বকের ক্ষেত্রেও গোসলের পরপরই ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন। নারকেল তেল কারও ত্বকে উপকারী হলেও মুখে বা ব্রণপ্রবণ ত্বকে ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকা দরকার।
এই ভুলগুলো করবেন না
সমুদ্র থেকে ফিরে ত্বক কালচে হয়ে গেলে অনেকেই দ্রুত ফর্সা করার আশায় স্ক্রাব, ব্লিচ বা বিভিন্ন ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার শুরু করেন। এতে উল্টো ত্বকে জ্বালা, প্রদাহ কিংবা আরও কালচে দাগ তৈরি হতে পারে। রোদে পোড়া ত্বক পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে ভারী মেকআপ, ফেশিয়াল, ব্লিচ বা শক্তিশালী কেমিক্যাল পিল এড়িয়ে চলাই ভালো। ত্বক খুব লাল হয়ে গেলে, ফোসকা পড়লে বা ব্যথা বাড়লে নিজে থেকে নানা প্রসাধনী না লাগিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ত্বকের যত্ন শুরু হোক ভেতর থেকেও
সুস্থ ত্বকের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবার জন্য একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন—তাই জোর করে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পান করার চেয়ে তৃষ্ণা, আবহাওয়া ও শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করুন। খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন কমলা, আমলকী, পেয়ারা, আমড়া, শসা ও অন্যান্য ফল-সবজি। এসব খাবার থেকে পাওয়া ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পানি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, সমুদ্রভ্রমণের পর ত্বক কিছুটা ট্যান হওয়া স্বাভাবিক। কয়েক দিনের মধ্যে ত্বকের রং বদলে ফেলতে গিয়ে কঠোর কোনো পদ্ধতি অনুসরণ না করে বরং সানস্ক্রিন, পরিচ্ছন্নতা, ময়শ্চারাইজিং, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সুষম খাবার—এই কয়েকটি বিষয় নিয়মিত মেনে চলাই ত্বকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।



