ঘোড়ায় বর, পালকিতে কনে, বরযাত্রীরা এলেন মহিষ ও গরুর গাড়িতে

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে বিয়ের আয়োজন। কোথাও বিলাসবহুল গাড়ির বহর, কোথাও আবার হেলিকপ্টারে বরযাত্রা—জাঁকজমকের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার সেই চেনা বিয়ের দৃশ্য। অথচ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামে একদিনের জন্য যেন ফিরে এসেছিল সেই সোনালি অতীত।
ঘোড়ায় চড়ে বিয়ের আসরে হাজির বর। সঙ্গে বরযাত্রীদের বহর—তবে কোনো আধুনিক গাড়িতে নয়, গরু ও মহিষের গাড়িতে। আর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কনেকেও নেওয়া হলো পালকিতে। চিরায়ত বাংলার বিয়ের এমন দৃশ্য দেখতে শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে বরিশাট গ্রামের রাস্তায় ভিড় করেন শত শত মানুষ।
গ্রামবাংলার পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরতেই এমন আয়োজন করেন মো. শ্রাবণ ও নাবিয়া ইকরার পরিবার। শ্রাবণ হলেন শ্রীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. বদরুল আলম লিটুর ছেলে। আর কনে নাবিয়া ইকরা পাশের টুপিপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল হালিম শেখের মেয়ে। বরযাত্রার বহরটিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শ্রাবণ ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে যান, আর তাঁর সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন স্বজন ও অতিথিরা। তাঁদের জন্য সাজানো হয়েছিল ১০টি গরুর গাড়ি ও পাঁচটি মহিষের গাড়ি। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা এই বহর যেন গ্রামের পথকে ফিরিয়ে দিয়েছিল বহু বছর আগের কোনো বিয়ের দিনের স্মৃতিতে।
শুধু বরযাত্রাই নয়, বিয়ের পর কনেকে শ্বশুরবাড়িতে নেওয়ার আয়োজনেও ছিল পুরোনো দিনের ছোঁয়া। নববধূ নাবিয়া ইকরা ওঠেন পালকিতে। সানাইয়ের সুর, ঢাক-ঢোলের বাদ্য আর উৎসুক মানুষের ভিড়ে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী।
বরযাত্রার বহর যখন গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাস্তার দুই পাশে জড়ো হতে থাকেন স্থানীয়রা। শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বয়োজ্যেষ্ঠরাও ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এই বিরল দৃশ্য দেখতে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখেছেন, কেউ আবার স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে ছবি তুলেছেন। মুহূর্তেই একটি পারিবারিক বিয়ে রূপ নেয় পুরো গ্রামের উৎসবে।
সানাইয়ের মিষ্টি সুর আর ঢাক-ঢোলের তালে বরিশাট গ্রামের পরিবেশও বদলে যায়। আধুনিকতার ব্যস্ততার মাঝেও এমন আয়োজন যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, বাঙালির বিয়ের সঙ্গে একসময় কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল ঘোড়া, পালকি, গরুর গাড়ি আর মহিষের গাড়ি। বর শ্রাবণ বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে স্মরণ করেই এমন আয়োজনের ইচ্ছা ছিল তাঁর। দীর্ঘদিনের সেই শখ বাস্তবায়নে দুই পরিবারের সম্মতিও ছিল।
নববধূ নাবিয়া ইকরার কাছে আয়োজনটির বিশেষত্ব আরও ব্যক্তিগত। ছোটবেলা থেকেই পালকিতে চড়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় নিজের আনন্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি। বরের বাবা মো. বদরুল আলম লিটুও জানান, পরিবারের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল ছেলের বিয়েতে একটু ভিন্ন ধরনের আয়োজন করার। সেই ইচ্ছা থেকেই ঘোড়া, গরু-মহিষের গাড়ি ও পালকির এই আয়োজন।
এক দিনের এই বিয়েতে হয়তো ফিরে আসেনি পুরোনো দিনের সেই সময়। কিন্তু বরিশাট গ্রামের পথে ঘোড়ার টগবগ শব্দ, গরু-মহিষের গাড়ির সারি আর পালকিতে নববধূ—সব মিলিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও হারিয়ে যেতে বসা বাংলার বিয়ের ঐতিহ্য যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল।



