বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

ওথেলো সিনড্রোম: ভালোবাসার সম্পর্কে যখন সন্দেহ হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভয়

0_5jbZB1FCZf8tsaq-

ভালোবাসার সম্পর্কে একটু-আধটু অভিমান, ঈর্ষা কিংবা সঙ্গীকে হারানোর ভয় অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ভয় যখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সম্পর্কের উষ্ণতা বদলে যেতে পারে অবিশ্বাস আর মানসিক চাপের মধ্যে। সঙ্গী কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কেন ফোন ধরতে দেরি হলো—এমন ছোট ছোট বিষয়ও যদি বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ বলে মনে হতে থাকে, সেটি হতে পারে ওথেলো সিনড্রোমের লক্ষণ।

ওথেলো সিনড্রোমকে সাধারণভাবে এমন একটি মানসিক অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে একজন ব্যক্তি পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলেও সঙ্গীর অবিশ্বস্ততা নিয়ে প্রবল ও অটল সন্দেহে ভুগতে থাকেন। এর নামকরণ হয়েছে শেকসপিয়রের বিখ্যাত নাটক Othello-এর চরিত্র ওথেলোর নাম অনুসারে। নাটকে ঈর্ষা ও সন্দেহ কীভাবে একজন মানুষকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, তারই প্রতীকী প্রতিফলন দেখা যায়।

সন্দেহের শুরুটা কোথায়?
ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে সাধারণত একটি সন্দেহ বারবার ঘুরতে থাকে—‘সে কি আমাকে ঠকাচ্ছে?’ এরপর শুরু হয় সেই সন্দেহের পক্ষে প্রমাণ খোঁজা। সঙ্গীর ফোন দেখা, মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন খুঁটিয়ে দেখা, কার সঙ্গে দেখা করছেন তা জানতে চাওয়া কিংবা বারবার একই প্রশ্ন করা—এসব আচরণ ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সমস্যা হলো, আশ্বস্ত করার পরও সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয় না। বরং একটি ব্যাখ্যা নতুন আরেকটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। ফলে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের চক্র—সন্দেহ, জিজ্ঞাসাবাদ, আশ্বস্ত করা, আবার সন্দেহ।

ভালোবাসা নাকি নিয়ন্ত্রণ?
অনেক সময় অতিরিক্ত ঈর্ষাকে ভালোবাসার প্রকাশ বলে মনে করা হয়। ‘সে আমাকে এত ভালোবাসে বলেই আমাকে নিয়ে ভয় পায়’—এমন ধারণাও প্রচলিত। কিন্তু ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। সঙ্গীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়া, পোশাক বা সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নির্দেশ দেওয়া কিংবা সন্দেহের কারণে অপমান করা কোনো সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে মানসিক নির্যাতন এমনকি শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

কেন এমন হয়?
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অতীতের বিশ্বাসভঙ্গ, সম্পর্কের নিরাপত্তাহীনতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা তীব্র ঈর্ষা সন্দেহকে বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মাদক বা অ্যালকোহলের ব্যবহার কিংবা অন্যান্য মানসিক সমস্যার সঙ্গেও এ ধরনের বিশ্বাস জড়িত থাকতে পারে।

Advertisements

তবে শুধু ঈর্ষা বা সন্দেহ থাকলেই কাউকে ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত বলা যায় না। এর মাত্রা, স্থায়িত্ব এবং বাস্তবতার সঙ্গে ব্যক্তির বিশ্বাসের সম্পর্ক—সবকিছু বিবেচনা করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন করেন।

কীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব?
প্রথম ধাপ হলো সমস্যাটিকে স্বীকার করা। বারবার প্রমাণ খোঁজার বদলে নিজের অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি—‘আমি কি সত্যিই কোনো প্রমাণ দেখছি, নাকি ভয় থেকেই একটি ঘটনা ব্যাখ্যা করছি?’

যদি সন্দেহ এতটাই তীব্র হয় যে সম্পর্ক, কাজ কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী সাইকোথেরাপি এবং কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও ব্যবহার করা হতে পারে।

ভালোবাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো বিশ্বাস। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয় অকারণ ভয়, তখন সম্পর্কের মানুষটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভালোবাসার সঙ্গী নয়, বরং সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু। তাই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে শুধু সঙ্গীকে বিশ্বাস করাই নয়, নিজের ভয় ও অনিরাপত্তাকেও বুঝতে শেখা জরুরি।

Advertisements