বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
বিশ্লেষণ

সেন্ট মার্টিনের নীল জলের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো শিশুদের স্বপ্ন

Saint_Martins_Island_with_boats_in_foreground

সাদা বালুর সৈকত, নীল জলরাশি আর প্রবালঘেরা সৌন্দর্যের কারণে সেন্ট মার্টিন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে দ্বীপটি। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থী বয়সী শিশু-কিশোরের এই দ্বীপে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে মাত্র ৭২৯ জন। ফলে ৩ হাজারের বেশি শিশুর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।শিক্ষকসংকট, দারিদ্র্য, অভিভাবকদের অসচেতনতা, সরকারি তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কাজে শিশুদের যুক্ত হয়ে পড়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিরা।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে সেন্ট মার্টিনে পৌঁছালে দ্বীপটির অন্য এক চিত্র চোখে পড়ে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বদলে অনেক শিশুর দেখা মেলে বালুচর, বাজার কিংবা দোকানের আশপাশে। পর্যটন বন্ধের মৌসুমে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। জেটির পূর্ব ও উত্তর পাশের বিস্তীর্ণ বালুচরে তখন কয়েক শ শিশু-কিশোর খেলাধুলায় ব্যস্ত। কেউ ফুটবল খেলছে, কেউ মার্বেল নিয়ে মেতে আছে। জেটির শেষ প্রান্তের বাজারেও শিশু-কিশোরদের দলবদ্ধভাবে সময় কাটাতে দেখা যায়।
জেটির পূর্ব পাশের সৈকতে ৩৫ শিশুর একটি দল খেলছিল। তাদের মধ্যে মাত্র দুজন বিদ্যালয়ে যায়। বাকি ৩৩ জনের কেউ স্কুলে ভর্তি হয়নি। স্কুলে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ১৪ বছর বয়সী মো. আলমের উত্তর, ‘স্কুলে স্যার নাই, ক্লাস হয় না, গিয়া কী করব?’

অন্য একটি দলে ১৩ শিশু মার্বেল খেলছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নয়জনই বিদ্যালয়ে যায় না। সাজেদা নামের এক শিশু জানায়, সে মক্তবে যায়, তবে স্কুলে পড়াশোনা করে না। পর্যটনের মৌসুমে শিশুরা হয়ে পড়ে শ্রমিক। ৮ ও ৯ আগস্ট কোনাপাড়া, দক্ষিণপাড়া, গলাচিপা, মাঝেরপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও উত্তরপাড়াসহ দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার উপযোগী বয়সের অনেক শিশু-কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। তাদের কেউ দোকানে সময় কাটাচ্ছে, কেউ বাজারে ঘুরছে, আবার কেউ বালুচরে খেলছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১১ হাজার মানুষের সেন্ট মার্টিনে শিক্ষার উপযোগী বয়সের শিশু-কিশোরের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। অথচ দ্বীপের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে মাত্র ৭২৯ জন।

নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটন মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এ সময় পর্যটকদের ব্যাগ বহন, গাইডের কাজ, ডাব বিক্রি কিংবা মাছ ধরার মতো কাজে শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ যুক্ত হয়ে পড়ে। অল্প সময়ে তুলনামূলক বেশি আয় হওয়ায় অনেক পরিবারও শিশুদের স্কুলের বদলে এসব কাজে পাঠাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, বছরের প্রায় নয় মাস নৌপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেন্ট মার্টিনের শিক্ষাব্যবস্থার নিয়মিত তদারকি কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা মাসে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা উপবৃত্তি পেলেও পর্যটকদের ব্যাগ বহন করে একদিনেই ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। ফলে বিদ্যালয়ে যাওয়ার তুলনায় তাৎক্ষণিক আয়ের আকর্ষণ অনেক বেশি।

Advertisements

সাত পদের বিপরীতে শিক্ষক মাত্র দুজন

সেন্ট মার্টিনের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দ্বীপের একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—জিনজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উত্তরপাড়ায় ৩৭ শতাংশ জমির ওপর ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক পদের সংখ্যা সাতটি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচটি পদ প্রায় ১৪ বছর ধরে শূন্য। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ তাহের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। দাপ্তরিক প্রয়োজনে তাঁকে টেকনাফে যেতে হলে বিদ্যালয়ের পুরো পাঠদানের দায়িত্ব পড়ে অন্য শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল হুদার ওপর।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২০০ জন। তবে পর্যটন মৌসুমে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০০-এর বেশি। বর্তমানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩০ শতাংশই ঝরে পড়ছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। টেকনাফ উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, দুর্গম দ্বীপ হওয়ায় সেখানে শিক্ষক পাঠানো ও ধরে রাখা কঠিন। অনেক শিক্ষক বদলি হয়ে চলে যান। তবে আগামী অক্টোবরের মধ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।

অর্থসংকটে বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় বেসরকারি স্কুল

শুধু সরকারি বিদ্যালয় নয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও সংকটপূর্ণ। কোনাপাড়ায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রিড প্রাথমিক বিদ্যালয়।বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিআরইইডি—পুনর্বাসন, শিক্ষা ও জীবিকায়ন উন্নয়ন কেন্দ্র—বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সংস্থাটি শিক্ষকদের বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া মাসিক বেতনের ওপর নির্ভর করেই বিদ্যালয়টি চালু রাখা হয়েছে।

বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক, মো. এরফান, দুই শিফটে ৬৬ শিশুকে পড়াচ্ছেন। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাসে ১০০ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৫০ টাকা করে বেতন নেওয়া হয়। কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা অনেক পরিবার সেই বেতনও নিয়মিত দিতে পারে না। শিক্ষক মো. এরফান বলেন, তহবিলের অভাবে নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও দিন দিন কমছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যালয়টি যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সৌন্দর্যের আড়ালে বড় প্রশ্ন

সেন্ট মার্টিনের পর্যটন অর্থনীতিতে শিশুদের অংশগ্রহণ অনেক পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক আয়ের সুযোগ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবনকে। শিক্ষক নেই, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নেই, অনেক পরিবারে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্বীপের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও পর্যটননির্ভর শ্রমবাজার।

ফলে পর্যটকদের কাছে যে দ্বীপ স্বর্গের মতো সুন্দর, সেই দ্বীপের হাজারো শিশুর কাছে ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সেন্ট মার্টিনের সাদা বালু আর নীল জলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাই জরুরি হয়ে উঠেছে আরেকটি প্রশ্ন—এই দ্বীপের শিশুরা কবে পাবে নিয়মিত বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং শিক্ষার নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ?

Advertisements