বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

তপ্ত রোদে পাখিদের জন্য আপনার বারান্দাই হতে পারে নিরাপদ আশ্রয়

1606356647_5fbf0ea797871_bird

শহর যত আধুনিক হচ্ছে, ততই কমে যাচ্ছে সবুজের পরিমাণ। কংক্রিটের ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর যানবাহনের ভিড়ে ঢাকা যেন ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে তার প্রাকৃতিক আবহ। এই বদলে যাওয়া শহরেও অবশ্য প্রতিদিন ভোরে কিচিরমিচির শব্দে জানান দেয় কিছু ছোট্ট প্রাণ—পাখি।

জানালার গ্রিল, বারান্দার রেলিং কিংবা ছাদের কার্নিশে বসে থাকা চড়ুই, ঘুঘু, বুলবুলি, শালিক বা কাক যেন শহুরে জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে এসব পাখির জন্যও জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিরাপদ পানি ও খাবারের অভাব তাদের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। পোষা প্রাণীর পাশাপাশি শহরের এই বুনো পাখিদের জন্যও সামান্য যত্নের ব্যবস্থা করা যায় বাড়ির বারান্দা থেকেই। খুব বেশি খরচও লাগে না। প্রয়োজন শুধু একটি পরিষ্কার পাত্র, কিছু উপযুক্ত খাবার আর নিয়মিত পানি দেওয়ার অভ্যাস।

খাবারের পাত্র কোথায় রাখবেন?

বারান্দায় পাখির জন্য খাবার বা পানি রাখার ক্ষেত্রে প্রথমেই ভাবতে হবে নিরাপত্তার কথা। পাখিরা শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি খুব দ্রুত টের পায়। বিশেষ করে বিড়াল সহজেই খাবারের পাত্রের আশপাশে লুকিয়ে থাকতে পারে।

তাই এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে পাখিরা আকাশ থেকে সহজেই পাত্রটি দেখতে পাবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত উড়ে যেতে পারবে। একই সঙ্গে জায়গাটি যেন বিড়াল বা অন্য কোনো শিকারি প্রাণীর নাগালের বাইরে থাকে। খাবারের পাত্র খুব নিচু জায়গায় না রেখে বারান্দার গ্রিল বা নিরাপদ উঁচু স্থানে রাখা যেতে পারে।

সব পাখির খাবার এক নয়

Advertisements

বারান্দায় খাবার রাখার পরও পাখি না এলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। হতে পারে খাবারটি আপনার এলাকার পাখিদের পছন্দের নয়। কারণ সব পাখির খাদ্যাভ্যাস এক রকম নয়।

চড়ুই, মুনিয়া, ঘুঘু বা পায়রার মতো অনেক পাখি বিভিন্ন ধরনের বীজ ও শস্য খেতে পছন্দ করে। সূর্যমুখীর বীজ, কুমড়ার বীজ, গম কিংবা ভুট্টা তাদের আকৃষ্ট করতে পারে। অন্যদিকে বুলবুলি, টিয়া কিংবা ফল খেতে অভ্যস্ত কিছু পাখির জন্য পেয়ারা, পেঁপে, জামসহ বিভিন্ন দেশি ফল ছোট ছোট টুকরো করে দেওয়া যেতে পারে। তবে খাবার দেওয়ার আগে সেটি পাখির জন্য নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

ঘরের খাবার ভাগ করে দিতে পারেন

পাখিদের জন্য সবসময় আলাদা খাবার কিনতে হবে—এমন নয়। বাড়িতে থাকা কিছু সাধারণ খাবারও দেওয়া যেতে পারে। রান্না করা ভাতের অল্প পরিমাণ কিংবা উপযুক্ত খাবারের ছোট অংশ অনেক পাখি খেতে পারে।

শহরের কাক তো খাবারের সন্ধানে বেশ দক্ষ। বিভিন্ন ধরনের খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজে বের করতে তাদের জুড়ি নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো উচ্ছিষ্ট খাবার তাদের দেওয়া যাবে।

পচা, দুর্গন্ধযুক্ত কিংবা দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা বাসি খাবার কখনোই পাখিদের দেওয়া উচিত নয়। খাবারের পাত্রও নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে, যাতে সেখানে জীবাণু বা ছত্রাক তৈরি না হয়।

খাবারের চেয়েও জরুরি পরিষ্কার পানি

গরমের দিনে পাখিদের জন্য খাবারের চেয়ে পরিষ্কার পানির প্রয়োজন আরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বাড়ে। বারান্দার গ্রিল, জানালার পাশে কিংবা নিরাপদ কোনো স্থানে ছোট মাটির পাত্র বা বাটিতে পানি রাখা যেতে পারে। পাত্রটি এমন হওয়া ভালো, যাতে পাখি সহজে বসে পানি পান করতে পারে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
পানি প্রতিদিন বদলে দিতে হবে। প্রচণ্ড গরমে সম্ভব হলে দিনে একাধিকবার পানি পরিবর্তন করা ভালো। পাত্রটিও নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।

জায়গা থাকলে অল্প গভীর কোনো পাত্রে পানি রাখা যায়, যেখানে পাখিরা পানি পান করার পাশাপাশি শরীরও ভিজিয়ে নিতে পারে। তবে পাত্রটি খুব গভীর হওয়া উচিত নয়।

পাখির জন্য এই ছোট উদ্যোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রকৃতিতে পাখিরা নিজেদের খাবার ও পানি নিজেরাই খুঁজে নেয়। কিন্তু শহর বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সুযোগও কমছে। গাছপালা কমে যাওয়া, পুরোনো বাড়ি ও খোলা জায়গা হারিয়ে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান কংক্রিটের কারণে পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। দেশি পাখির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিদেরও খাবার ও পানির নিরাপদ উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেমন বিভিন্ন পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, তেমনি অনেক পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বিস্তারেও ভূমিকা রাখে।
একসময় ঢাকার আকাশে ও অলিগলিতে কাকের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শহরের নানা জায়গায় তাদের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। এখন সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বহু পাখির সংখ্যাও কমে আসছে।

এই পরিবর্তন হয়তো প্রতিদিন আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু প্রকৃতি থেকে একটি একটি করে প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর।

তাই বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা না করে নিজের বারান্দা থেকেই শুরু করা যায়। এক কোণে একটি ছোট পাত্রে পরিষ্কার পানি, পাশে কয়েক মুঠো বীজ বা উপযুক্ত খাবার—এই সামান্য আয়োজনই তীব্র গরমে কোনো পাখির জন্য হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার এক গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।

শহর আমাদের হলেও আকাশটা শুধু আমাদের নয়। সেই আকাশে ডানা মেলা পাখিদের জন্য একটু জায়গা, একটু পানি আর সামান্য খাবার রেখে দেওয়াও হতে পারে প্রকৃতির প্রতি আমাদের ছোট্ট কিন্তু সুন্দর দায়িত্ব।

Advertisements