বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

আজ জাতীয় দেবদূত দিবস: অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর দিন

আজ জাতীয় দেবদূত দিবস: অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর দিন

মানুষের জীবনে কখনও কখনও একজন মানুষের সামান্য সাহায্যই হয়ে উঠতে পারে আশার আলো। বিপদের মুহূর্তে বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাত, মন খারাপের দিনে বলা কয়েকটি আন্তরিক কথা কিংবা নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ এসবই আমাদের কাছে তাকে ‘দেবদূত’ করে তুলতে পারে। সেই মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো এবং নিজেরাও অন্যের জীবনে তেমন একজন হয়ে ওঠার আহ্বান জানায় দেবদূত বা হয়ে ওঠার দিবস।

প্রতি বছর ২২ আগস্ট পালিত হয় দেবদূত দিবস (Be an Angel Day)। এটি মূলত মানুষকে দয়া, সহানুভূতি, ভালোবাসা ও সহযোগিতার চর্চায় উৎসাহিত করার একটি অনানুষ্ঠানিক দিবস। দিনটির মূল বার্তা খুব সহজ, অন্যের জীবনে একজন দেবদূতের মতো হয়ে উঠুন। বড় কোনও কাজের মাধ্যমে নয়, বরং ছোট ছোট মানবিক আচরণ দিয়েও একজন মানুষের দিনটিকে সুন্দর করে তোলা সম্ভব।

এই দিবসটির ইতিহাস মূলত মানবিকতার সঙ্গে জড়িত। মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জন্য ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে জেন হাওয়ার্ড ফেল্ডম্যান ১৯৯৩ সালে দেবদূত হয়ে ওঠার দিবসের সূচনা করেন। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দিবসটির পরিচিতিও বাড়তে থাকে। একটি ছোট ভালো কাজ কীভাবে অন্য একটি ভালো কাজের অনুপ্রেরণা হতে পারে, সেই ধারণাটিও এই দিবসের মূল চেতনার সঙ্গে জড়িত।

এই ভাবনার সঙ্গে ‘ভালো কাজটি অন্যের কাছে পৌঁছে দিন’ ধারণারও মিল রয়েছে। একজন মানুষের করা ছোট্ট একটি ভালো কাজ যখন আরেকজনকে ভালো কিছু করতে অনুপ্রাণিত করে, তখন সেই ইতিবাচকতা এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে একটি ছোট উদ্যোগও অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

হয়তো কোনও এক কঠিন সময়ে কেউ আপনাকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। হয়তো কোনও দমকলকর্মী নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাউকে আগুনে জ্বলতে থাকা ভবন থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আবার কখনও সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষও বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। এমন মানুষ আমাদের জীবনে কমবেশি সবারই এসেছে। তাদের কেউ হয়তো সামান্য একটি সাহায্য করেছেন, যা একটি খারাপ দিনকে সহজ করে দিয়েছে; আবার কারও একটি সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ হয়তো পুরো জীবন বদলে দিয়েছে।

জীবনের এমন মুহূর্তে আমরা অনেকেই মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই সেই মানুষটির জন্য। দেবদূত হয়ে ওঠার দিবস সেই কৃতজ্ঞতাকে স্মরণ করার পাশাপাশি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের জন্য আমরাও একজন ‘দেবদূত’ হয়ে উঠতে পারি।

Advertisements

অন্য মানুষের দয়া ও সহানুভূতি ছাড়া জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠত। বিপদের সময় কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আমরা প্রায়ই অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করি। জীবনের পথ সবসময় মসৃণ নয়। অনেক সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা একা সামলানো কঠিন। কিন্তু মানুষ যখন একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তখন কঠিন পথও কিছুটা সহজ হয়ে ওঠে।

মানবজাতির অন্যতম সুন্দর দিক হলো এই পারস্পরিক সহযোগিতা। আর এই সাহায্য সবসময় পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না। অনেক সময় সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষও এমনভাবে পাশে দাঁড়ান, যা দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়। দেবদূত হয়ে ওঠার দিবস সেই মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার চর্চাকেই সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে এটি আমাদের নিজেদের ভেতরের দয়ালু, সহানুভূতিশীল ও সাহায্যপ্রবণ দিকটি প্রকাশ করার সুযোগ দেয়।

জীবনে সবারই খারাপ দিন আসে। ভুল পরিকল্পনা, দুঃসংবাদ কিংবা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনও ঘটনা আমাদের মন খারাপ করে দিতে পারে। কখনও আবার কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মন ভার হয়ে থাকে। এমন সময়ে যারা আমাদের একটু ভালো অনুভব করান, তাদের উপস্থিতি উপলব্ধি করা জরুরি। তাদের ইতিবাচকতা, আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা ও ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।

দেবদূত হয়ে ওঠার দিবস উদযাপনের জন্য বিশেষ কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট কাজের মধ্যেই এর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেশীর বাড়ির উঠান পরিষ্কার করে দেওয়া, তার সন্তানদের কয়েক ঘণ্টা দেখাশোনা করে তাকে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দেওয়া কিংবা কাছের কোনো মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সবই হতে পারে এই দিনের সুন্দর উদযাপন।

প্রিয়জনকে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠানো, কারও জন্য একটি আন্তরিক ফোনকল করা কিংবা শুধু ‘ধন্যবাদ’ বলা এসব ছোট্ট কাজও মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অব্যবহৃত পোশাক বা ঘরের প্রয়োজনহীন জিনিস অসহায় মানুষের মধ্যে দান করা, কোনও দাতব্য কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হওয়া, গাছ লাগানো কিংবা আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করাও হতে পারে মানবিকতার প্রকাশ।

এমনকি সম্পূর্ণ অপরিচিত কাউকে ফুল উপহার দেওয়া বা তার সঙ্গে কয়েকটি সুন্দর কথা বলাও হতে পারে একজন দেবদূতের মতো আচরণ। কারণ ভালো কাজের জন্য সবসময় বড় সুযোগের অপেক্ষা করতে হয় না। অনেক সময় একটি ছোট্ট সদয় আচরণই কারও মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট।

ভালো কাজের ফল সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। তবে একজন মানুষকে সাহায্য করার মাধ্যমে তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব, আজীবন কৃতজ্ঞতা কিংবা নিজের মধ্যেই জন্ম নিতে পারে ভালো কিছু করার তৃপ্তি। তাই প্রতিদিনের জীবনে আরও দয়ালু হওয়া এবং আশপাশের মানুষের কষ্ট ও প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।

দেবদূত হয়ে ওঠার দিবস হতে পারে ক্ষমা করারও একটি উপলক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে কারও প্রতি অভিমান বা ক্ষোভ পুষে রাখলে সেই ভার আমাদের নিজেদের মনেই থেকে যায়। অতীতে কেউ কষ্ট দিয়ে থাকলে তার সঙ্গে কথা বলে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কখনও কখনও হৃদয় খুলে কথা বলাই পুরোনো ক্ষত সারানোর প্রথম পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।

অন্যের জন্য প্রার্থনা করাও এই দিনের একটি সুন্দর অংশ হতে পারে। কোনও বন্ধু, প্রিয়জন কিংবা এমনকি কোনও অপরিচিত মানুষের জন্যও শুভকামনা জানানো যায়। কাছের মানুষকে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠিয়ে জানানো যায় যে তার কথা মনে পড়ছে, তাকে ভালোবাসা হচ্ছে কিংবা তার জন্য শুভকামনা রয়েছে। এমন একটি সাধারণ বার্তাও কারও মুখে হাসি এনে দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত দেবদূত হয়ে ওঠার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেবদূত হতে কোনও অলৌকিক ক্ষমতার প্রয়োজন নেই। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভালো কথা বলা, ক্ষমা করা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনের সময় সামান্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াই যথেষ্ট।

তাই ২২ আগস্ট দেবদূত হয়ে ওঠার দিবসে শুধু জীবনে যারা আমাদের জন্য দেবদূতের মতো ছিলেন, তাদের স্মরণ করাই নয়, নিজেরাও কারও জীবনে একটু আনন্দ, স্বস্তি, সাহস কিংবা আশার আলো হয়ে ওঠার চেষ্টা করা যাক।

Advertisements