বয়সকে হার মানিয়ে শাম্মীর পাওয়ারলিফটিংয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ১২০ কেজি বা তার বেশি ওজন তুলে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন করছেন শাম্মী নাসরিন। একসময় শারীরিক সুস্থতার জন্য বড় ছেলের সঙ্গে জিমে যাওয়া শুরু করেছিলেন তিনি। ছেলে পরে জিম ছেড়ে দিলেও শাম্মী আর থামেননি। সেই শখই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ভালোবাসায়, আর সেই ভালোবাসা তাকে নিয়ে গেছে পাওয়ারলিফটিংয়ের আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

২০১৯ সালে পাওয়ারলিফটিং শুরু করা শাম্মীর আগে খেলাধুলার সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে নিজেকে সুস্থ রাখাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু জিমে ওজন তোলার সক্ষমতা দেখে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক পাওয়ারলিফটিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২০ সালের বাংলাদেশ পাওয়ারলিফটিং ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে তাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে অন্য নারীদেরও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়।
এরপর একে একে সাফল্য আসতে থাকে। শাম্মী তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন এবং জাতীয় পর্যায়ে নয়টি রেকর্ড গড়েছেন। ২০২৩ সালে এশিয়ান পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পদক জেতেন তিনি। ওই আসরে উইমেন মাস্টার-১ অনূর্ধ্ব-৬৩ কেজি বিভাগে স্কোয়াটে ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেন। ২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ওপেন অ্যান্ড মাস্টার্স ক্ল্যাসিক পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ৬৩ কেজি মাস্টার-২ বিভাগে সাফল্য পান। স্কোয়াট, বেঞ্চ প্রেস ও ডেডলিফটে মোট ৩২২ দশমিক ৫ কেজি ওজন তুলে তিনি তিনটি স্বর্ণ ও একটি ব্রোঞ্জপদক জয় করেন।
শাম্মীর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর নিয়মের জীবন। প্রায় ৬৩ কেজি ওজন ধরে রাখতে তিনি খাবারের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। সেদ্ধ শাকসবজি, মুরগির বুকের মাংস, লাল চালের অল্প ভাতসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার তার খাদ্যতালিকায় থাকে। কোনো কোনো দিন ১০টি ডিমও খেতে হয়। নিয়মিত শরীরচর্চা শুরু করার পর তার ডায়াবেটিসের সমস্যাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানান তিনি।

দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্বামী, ছেলেদের স্ত্রী ও নাতিকে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের দায়িত্ব সামলে নিয়মিত জিমে যান শাম্মী। কখনো শাড়ি পরেই জিমে গিয়ে ব্যায়াম করেছেন, এমনকি প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছেন। তার স্বামী শামসুল হকও এখন তার অন্যতম বড় সমর্থক। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়, অনেক সময় তিনিই সেই ব্যয় বহন করেন। শাম্মীর ভাষায়, পরিবারের সমর্থন না থাকলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।
শাম্মীর মেয়ে হৃদিশা মৌরিনও মায়ের অর্জন নিয়ে গর্বিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য এলেও পরিবারের সদস্যরা সেগুলো উপেক্ষা করেন। অন্যদিকে যে জিমে শাম্মী প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন, সেখানে অনেকেই তাকে ‘আন্টি’ বলে ডাকেন। সহপ্রশিক্ষকদের কাছে তিনি এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার বয়সে একজন নারী যেভাবে শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভারোত্তোলন করেন, তা দেখে নারী-পুরুষ উভয়েই উৎসাহিত হন।
শাম্মীর পথচলা অবশ্য সবসময় সহজ ছিল না। সংসারের কাজ, চাকরি, প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাকে। এমনকি ছেলের বিয়ের দিনও সকালে পাওয়ারলিফটিংয়ের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে অংশ নিয়ে পরে বিয়ের আয়োজন সামলেছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ব্যয়, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দাম এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের খরচও কম নয়। তারপরও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি তিনি।

পাওয়ারলিফটিং মূলত স্কোয়াট, বেঞ্চ প্রেস ও ডেডলিফট—এই তিন ধরনের লিফটের ওপর নির্ভরশীল শক্তির খেলা। প্রতিটি বিভাগে একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ কত ওজন তুলতে পারেন, তার ভিত্তিতে ফল নির্ধারণ করা হয়। শাম্মী এখন নিয়মিত অনুশীলনে ১২০ কেজি বা তার বেশি ওজন তোলেন। তার লক্ষ্য আরও বড়—বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে দেশের জন্য সাফল্য এনে দেওয়া।
শাম্মীর স্বপ্ন শুধু নিজের অর্জনে থেমে নেই। তিনি চান, তার পথ দেখে আরও বেশি বয়সী নারী শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় এগিয়ে আসুন। তার বিশ্বাস, বয়স কোনো বাধা নয়; সুস্থ থাকার ইচ্ছা, নিয়মিত অনুশীলন, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে নতুন করে শুরু করা সম্ভব।
৫৪ বছর বয়সে যখন অনেকেই জীবনের ব্যস্ততা থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন, তখন শাম্মী নাসরিন নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। সংসারের দায়িত্ব শেষ করে তিনি প্রতিদিন জিমে যান, কঠোর অনুশীলন করেন এবং নিজেকে প্রস্তুত করেন আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য। এখন তার চোখ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে। তার গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন দেখার জন্য বয়স কখনোই বাধা হতে পারে না।
তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো



