Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আধুনিক বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান!

শ্রীমাভো বন্দরনায়েক

বর্তমানে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় বিশ্বের কয়েকজন নারী রাষ্ট্রপ্রধানের নাম বলতে। অনায়াসেই চোখ বন্ধ করে যে কেউ কয়েকজন নারীর নাম বলতে পারবেন। কিন্তু ১৯৬০ সালের আগে এ বিষয়টি ছিল কেবলই বিস্ময়। একজন নারী সরকার প্রধানকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৎকালীন সমাজে ছিল না। ঠিক সে সময়টাতে পৃথিবীর প্রথম নারী সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েক।

১৯৬০ সালের ২১ জুলাই তিনি শ্রীলংকার (তৎকালীন সিলন) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর একে একে বিশ্বের অনেক দেশেই নারী সরকার প্রধান গঠিত হতে থাকে। যেমন ছয় বছরের মাথায় ১৯৬৬ সালের ২৪ এপ্রিল পৃথিবীর দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এরপর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনেক নারী রাষ্ট্রপ্রধান দেখেছে বিশ্ব। কিন্তু নারীদের জন্য এ দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিলেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েক।

১৯১৬ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি সিলনে এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম তাঁর। তাঁর বড় হয়ে ওঠা রাজনীতি দেখে দেখে। তাঁর বাবা বারনেস রাতায়াত্তে ছিলেন স্টেট কাউন্সিলের সদস্য এবং ব্রিটিশ সিলনের সিনেটর। শুধু জন্ম রাজনৈতিক পরিবারে তাই নয়, বৈবাহিক সূত্রেও আবদ্ধ হন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সলোমন ওয়েস্ট রিজওয়ে ডায়াস বন্দরনায়েকের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর।

শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের স্বামী সলোমন ১৯৫৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে শ্রীলঙ্কার চতুর্থ সরকার প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তার তিন বছরের মাথায় ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যা করা হয়। সলোমন ছিলেন ফ্রিডম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর মৃত্যুতে দলটির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায় এবং বিশাল শূন্যতা তৈরি হয় , যার ফলস্বরূপ ১৯৬০ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি হেরে যায়।

কিন্তু এরপরই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠে নামেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েক। স্বামীর মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে ঘরে মুখ লুকিয়ে নয় বরং মাঠে নেমে হাল ধরেন স্বামীর প্রতিষ্ঠা করা ভেঙে পড়া সে দলটির। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা শ্রীমাভোর খুব একটা অসুবিধে হয় নি তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতাকে কাজে লাগাতে। বরং বেশ ভালো ভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন তার রাজনৈতিক জ্ঞান। যার ফলস্বরূপ মাত্র চারমাসের মাথায় আবারো ক্ষমতায় আসে শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি।

একদিকে বিশ্ব দেখছিলো এক নারীর বিচক্ষণতা ও ক্ষমতা, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছিল ইতিহাস। বিশ্বের প্রথম নারী সরকার প্রধান তৈরির ইতিহাস৷ সে যাত্রায় ১৯৬০ সালের ২১ জুলাই তিনি তৎকালীন স্বাধীন সিলনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর ১৯৬৫ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এর পাঁচ বছর পর আবারও ১৯৭০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন তিনি। তাঁর শাসনকালে দেশটিতে বেশ অনেক ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসেন তিনি। তার মধ্যে অন্যতম হলো সিলন থেকে দেশের নাম পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কা রাখা।

তবে রাজনৈতিক জীবনে ওঠানামা তো লেগেই থাকে। কখনো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ভাসলেও হঠাৎ করেই নেমে আসতে পারে ধস। যেমনটা হয়েছিলো শ্রীমাভোর সঙ্গে। হুট করেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় ক্ষমতার অপব্যবহারের। এরপর তৃতীয় দফায় তিনি ১৯৯৪ সালে আবারো সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালের ১০ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার একাদশতম সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও আর রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া হয়নি তাঁর। নির্বাচনের দিন নিজের ভোট দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই মৃত্যুবরণ করেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েক।

আর নতুন করে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নেয়া না হলেও, তার দেখানো পথ ধরে হেঁটে চলছে নারীরা। নারীদের জন্য তিনি তৈরি করে দিয়েছেন সম্ভাবনার পথ, তৈরি করেছেন নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আজও বহু নারীদের কাছে রোল মডেল শ্রীমাভো বন্দরনায়েক।

অনন্যা/জেএজে