Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সাফ-চ্যাম্পিয়ন নারী: সমাজে কতটা প্রভাব ফেলবে

জান্নাতুল-যূথী


নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীকে বন্দিদশা থেকে প্রথম মুক্ত করতে এগিয়ে এসেছিলেন। তার হাত ধরেই বাঙালি নারীর জীবনে সূর্যের আলোকচ্ছটা এসে লাগে। নারীদের বেঘোর ঘুম ভাঙাতে সজোরে পানির ঝাপটা তিনিই দেন। অচেতন নারীরা জেগে দেখলেন তারা এক শিকলে বন্দি। আর সেই শিকলের ভার এতই বেশি যে এই একুশ শতকের আধুনিকতার যুগেও নারীকে পেছনে টেনে ধরে। খামচে ধরে নারীর অগ্রযাত্রার পথকে।

নারীকে বেঁধে রাখতে চায় পরিবারের সম্মান, সমাজের কটাক্ষ, বিদ্রূপ আর শাসন-শোষণের আজব নীতিমালায়। সর্বোপরি নারীকে বন্দি করতে ফাঁদ পাতে অপকৌশলের। যার প্রধান হাতিয়ার ধর্মীয় অপব্যাখ্যা। কারণ একটাই তাদের চোখে নারী কোন মানুষ নয়। শুধু একখণ্ড মাংসপিণ্ড। যার নাম দেওয়া হয়েছে নারী।

ঘরের-বাইরে তাদের যেতে নেই। বেশি শিক্ষায় কাজ নেই। স্বামীর খেদমতেই তার জান্নাত আর না করলে জাহান্নাম। সবই যেন নারীর জন্য প্রণীত কড়া নীতিমালা। এর বাইরে নারী অস্পৃশ্যা। ফলে কোনোভাবেই নারীকে এর বাইরে যেতে দেওয়া চলবে না। তার জন্য পুরুষতন্ত্র যেন জীবন দিতেও প্রস্তুত। ঘরের আলো বাইরে বের হলে তাদের পথ অন্ধকার এই তাদের ভয়।

নারীর জীবনের গতিকে রুদ্ধ করতে প্রগতিশীল চিন্তার বদলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় মোল্লাতন্ত্রের আজব সব ফন্দি-ফিকির। আর পুরুষতান্ত্রিক চেতনাপুষ্টদের আজব নীতিমালায় ধরা দেয় অসংখ্য নারী। কিন্তু যারা অবরুদ্ধ দেওয়ালের বুকে পদাঘাত করতে পারে তারাই ইতিহাস রচনা করে। সৃষ্টি করে বন্ধুর পথে বিজয়গাথা।

এখন শুধু নারীরা এগিয়ে যাবে আর পেছনে তাকানোর সময় নাই তাদের।

সমাজের কটুকথা, পরিবারের অসচ্ছলতা, দারিদ্র্য, হতাশাকে পেছনে ফেলে যদি এই নারীরা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ান হতে পারে, তবে বাংলাদেশের আরও অসংখ্য নারীও পারবে তাদের জীবনকে বিজয়ের স্বাদ দিতে। গড়ে তুলতে পারবে আপন ভুবন।

বর্তমানে বাংলাদেশের নারীরাও গড়ে তুলেছে নতুন ইতিহাস। পুরুষতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জিতে নিয়েছে ট্রফি। বলছি বাংলাদেশের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ান নারীদের কথা। যেই নারীরা দেখিয়েছে শত বাধা কিভাবে পেরিয়ে নিজেদের সম্মানকে উচ্চে তুলে ধরা যায়। এই নারীদের কারোরই ব্যক্তিগত জীবনের গল্প বাধাহীন নয়। সবাই সমাজের নানারকম কটু-কথাকে উপেক্ষা করেই নিজের ভবিষ্যৎ জীবনকে স্বর্ণোজ্জ্বল করেছেন। বয়ে এনেছেন একটি দেশের অবারিত সম্মান।

সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ান নারীদের একেকজনের গল্প সমগ্র জাতির জন্য সর্বোপরি বাঙালি নারীদের জন্য চরম শিক্ষা। নারীদের সম্মুখে এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কিছুই হতে পারে না। বাধাকে ভাঙতে পারলেই আসে জয়। যে জয়কে কুর্নিশ করতেও দ্বিধা করে না সমাজ-রাষ্ট্র! সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়শিপে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের এসব নারী। নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দিয়ে সাফ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরেছে। এই শিরোপা জয়ে দেশবাসীও তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সাবিনা, কৃষ্ণা রানি সরকার, নিলুফা, সানজিদারা যেই কৃতিত্ব, সুনাম দেশের জন্য বয়ে এনেছেন; তা এক নতুন বিপ্লব। নারী জাগরণের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

বেগম রোকেয়া নারীর শিক্ষাকে সূদরপ্রসারী করার যে তাগিদ দিয়েছিলেন বর্তমান সাফ চ্যাম্পিয়ান নারীরা দিলেন আরও নতুন বার্তা। সমাজের ঘোর টোপ থেকে বের হতে পারলেই জয়কে চেনা যায়। নিজের সাফল্যকে ধরা যায়। বয়ে আনা যায় সম্মান, ভালোবাসা। গড়া যায় ইতিহাস। ভেঙে ফেলা যায় কড়া শোষণের দেয়াল। এই নারীরা যে বিপ্লবী বাঘিনী তার প্রমাণ তারা দিয়েছেন। তারাই নারীদের সামনে আদর্শ আলোকবর্তিকা। একটি জাতির ঘুম ভাঙাতে এর থেকে বড় পদাঘাত আর হতে পারে না।

খেলার মাঠে কৃষ্ণাদের এক একটি বলের পদাঘাত বাঙালির মস্তিষ্কে গজিয়ে ওঠা কুসংস্কার, ধর্মান্ধতাকে পদাঘাত। এই নারীরা সেই শিকল ভেঙেছেন নিজেদের শক্তিতে। তাই আজ তারা বিজয়ীর বেশে সদর্পে অভিনন্দিত হলেন। এই শক্তিতেই জাগুক বর্তমান নারী সমাজ। রুখে দিক নিজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়-অবিচারকে। ভেঙে বেরিয়ে আসুক সত্যের সন্ধানে, জীবনের উন্নয়নে। সৃষ্টি হোক আরও বিজয়ের পথ। গড়ে উঠুক নারীর সুস্থ জীবন, সুস্থ পরিবেশ। নারীরাই পারে সামনের দিনে এই বিজয়ের সঙ্গে নিজেদের বিজয়কে ছিনিয়ে আনতে। এটাই বলবো রাত পেরিয়ে গেছে। এখন শুধু নারীরা এগিয়ে যাবে আর পেছনে তাকানোর সময় নাই তাদের।

সমাজের কটুকথা, পরিবারের অসচ্ছলতা, দারিদ্র্য, হতাশাকে পেছনে ফেলে যদি এই নারীরা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ান হতে পারে, তবে বাংলাদেশের আরও অসংখ্য নারীও পারবে তাদের জীবনকে বিজয়ের স্বাদ দিতে। গড়ে তুলতে পারবে আপন ভুবন।