বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
নারী

ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া জোগাতে নিজের চুলই বিক্রি করলেন রেহানা

8fbc5450-ec00-4854-8664-f05bb80d3638

দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন রেহানা খাতুন। দুই সন্তানকে নিয়ে এখন তার ঠিকানা খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের খোলা জায়গা। সংসারের খরচ চালানো তো দূরের কথা, ঘরের ভাড়াও পরিশোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাকে।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুনের এই করুণ ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর মর্মবেদনার সৃষ্টি করেছে। অসহায় এই নারী এখন দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সামান্য একটু নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় রেললাইনের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘরের কাঠামো তৈরি করলেও অর্থের অভাবে সেটি এখনো বসবাসের উপযোগী করে তুলতে পারেননি।

রেহানা আগে দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন ধরে ঘরের ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একপর্যায়ে সেই আশ্রয়টুকুও হারাতে হয় তাকে। কোনো উপায় না পেয়ে সন্তানদের নিয়ে তিনি খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে সরকারি জমিতে আশ্রয় নেন।

বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করেছেন রেহানা। কিন্তু কয়েক মাস ধরে কাঠামোটি একই অবস্থায় পড়ে আছে। টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে না পারায় ঘরটি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই দুই সন্তানকে নিয়ে সেখানে দিন কাটাতে হচ্ছে তাকে।

Advertisements

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন তিনি রেহানাকে মাথায় চুল ছাড়া অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করার জন্য বাধ্য হয়ে তিনি নিজের চুল বিক্রি করেছেন।

ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন দেখি তার মাথায় চুল নেই। জিজ্ঞেস করলে কান্নাকাটি করে জানায়, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে সে তার চুল বিক্রি করেছে।’

রহিম শেখ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রেহানার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে তার। সন্তানদের নিয়ে থাকার মতো একটি নিরাপদ ঘরও নেই। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে সে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করব, যেন দ্রুত তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়।’

মহিদুল ইসলাম নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রেহানার জন্য বাঁশ দিয়ে ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করা গেলে সেখানে একটি ঘর তৈরি করা সম্ভব। এলাকার সচ্ছল মানুষ এবং সমাজের মানবিক ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে রেহানা ও তার দুই সন্তান অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি একটি ঘরের কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই অসম্পূর্ণ কাঠামোর পাশেই দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন রেহানা। ঘরের চারপাশে এখনো টিন বা বেড়া দেওয়া হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াতেই সেখানে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও সন্তানদের নিয়ে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে রেহানা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই সব ধরনের কষ্ট সহ্য করে যাচ্ছেন তিনি। ঘর না থাকার পাশাপাশি খাবারেরও সংকট রয়েছে। সংসারের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের চুল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

রেহানা খাতুন বলেন, ‘দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।’

এলাকাবাসীর দাবি, রেহানার মতো অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও এগিয়ে আসা দরকার।

তাদের মতে, সামান্য সহযোগিতাই রেহানা ও তার দুই সন্তানের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একটি নিরাপদ ঘর পেলে অন্তত রোদ-বৃষ্টি থেকে সন্তানদের রক্ষা করে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ পাবেন এই অসহায় নারী।

তথ্য সূত্রঃ আগামীর সময়

Advertisements
চুলদারিদ্র্যতাবিক্রিরেহানা