২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

নীরব প্রশান্তির বার্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক দীপ্তিময় শান্তি দিবস

Peace-Day

শান্তি বলতে আমরা অনেক সময় যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা বড় কোনো সামাজিক পরিবর্তনের অনুপস্থিতিকে বুঝি। অথচ ব্যক্তিজীবনে শান্তির প্রকাশ ঘটতে পারে আরও ছোট ও সাধারণ কিছু মুহূর্তে। প্রিয় মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলা, কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিপদে কাউকে সহযোগিতা করা কিংবা ব্যস্ততার ভিড়ে কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখা—এসবও এনে দিতে পারে মানসিক প্রশান্তি। এমন ব্যক্তিগত ও মানবিক শান্তির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে পালিত হয় আন্তর্জাতিক দীপ্তিময় শান্তি দিবস।

দিবসটির মূল ভাবনা হলো, শান্তির চর্চা কেবল সমাজ বা রাষ্ট্রের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর শুরু হতে পারে একজন মানুষের নিজের ভেতর থেকেই। নিজের আবেগ ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং মতপার্থক্যের সময় ধৈর্য ধরে কথা বলার অভ্যাসও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

একটি সুন্দর কথা যেমন কারও মন ভালো করে দিতে পারে, তেমনি সামান্য সহযোগিতাও কঠিন সময়ে একজন মানুষের জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে। কারও সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনা, বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা না করে পাশে দাঁড়ানো কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

দিবসটির সূচনা হয় ১৯৯৯ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন দীপ্তিময় শান্তি আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশন এর সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনটি ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সদাচরণ, ইতিবাচক চিন্তা এবং ব্যক্তিগত মানসিক ভারসাম্য তৈরির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়াই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রথম দিকে দিবসটি ২২ জুন পালিত হতো। পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়কে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে দিবসটির তারিখ পরিবর্তন করে ২২ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন জায়গাতেও দিবসটির ভাবনা ছড়িয়ে পড়ে।

শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। মতের অমিল হলে রেগে যাওয়া বা আক্রমণাত্মক আচরণের পরিবর্তে অন্যের বক্তব্য শোনা, নিজের মত শান্তভাবে প্রকাশ করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর শিক্ষা তাদের ভবিষ্যৎ আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisements

নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যও প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করা যেতে পারে। নিরিবিলি জায়গায় হাঁটা, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা, কিছুক্ষণ নীরবে থাকা কিংবা নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবার মতো সাধারণ অভ্যাস ব্যস্ত জীবনের চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অন্যের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতেও বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। কাউকে উৎসাহ দেওয়া, ভালো কাজের প্রশংসা করা, প্রতিবেশীর প্রয়োজনে সহযোগিতা করা, কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিংবা প্রিয়জনকে নিজের অনুভূতির কথা জানানো—এমন ছোট কাজও সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা তৈরি করতে পারে। একটি ভালো আচরণ হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না, তবে একজন মানুষের দিনটিকে সুন্দর করে দিতে পারে।

শান্তির বার্তা প্রকাশে শিল্পও হতে পারে কার্যকর মাধ্যম। ছবি আঁকা, রং করা কিংবা সৃজনশীল কোনো কাজের মাধ্যমে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার ভাবনা প্রকাশ করা যায়। একইভাবে কবিতা, গল্প বা ব্যক্তিগত অনুভূতি লেখার মাধ্যমেও শান্তি সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি তুলে ধরা সম্ভব।

শান্তি প্রতিষ্ঠার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে আলোচনার সময় শুধু নিজের বক্তব্য তুলে ধরার বদলে অন্যের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক দীপ্তিময় শান্তি দিবস তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আয়োজন নয়; বরং প্রতিদিনের আচরণে শান্তি ও মানবিকতার চর্চা করার একটি স্মরণীয় উপলক্ষ। একটি সদয় বাক্য, সহানুভূতির হাত কিংবা মনোযোগ দিয়ে কারও কথা শোনার মতো ছোট উদ্যোগ থেকেই শান্তির চর্চা শুরু হতে পারে।

Advertisements