বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

বয়স বাড়লেই কেন হারিয়ে যায় ছোটবেলার প্রিয় বন্ধুরা?

SAH_blog48_Montessori_Lexxion-1536×1063.jpg (1) (1)

ছোটবেলায় এমন বন্ধু ছিল, যার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ মনে হতো। স্কুল ছুটির পর একসঙ্গে বাড়ি ফেরা, টিফিন ভাগাভাগি কিংবা সামান্য বিষয় নিয়ে হাসাহাসি- বন্ধুত্বের সেই দিনগুলো ছিল জীবনের সবচেয়ে সহজ-সরল সময়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও হয়তো এমন কেউ ছিল, যার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, একই নোট ভাগাভাগি করে পড়া কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে একসঙ্গে জেগে থাকা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষগুলোই যেন ধীরে ধীরে জীবন থেকে হারিয়ে যায়। কোনো ঝগড়া হয়নি, সম্পর্ক ভাঙার ঘোষণাও আসেনি। তবু মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর তাদের সঙ্গে কথা হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা কিংবা পুরোনো ছবিতে একটি ‘লাইক’- সেখানেই যেন আটকে থাকে একসময়কার গভীর বন্ধুত্ব।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতারই অংশ। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরোনো বন্ধুত্ব হারানোর কষ্ট অনেক সময় প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বেদনার মতোই গভীর হতে পারে।

কেন দূরে সরে যায় বন্ধুরা?

শৈশব ও কৈশোরের অধিকাংশ বন্ধুত্ব তৈরি হয় কাছাকাছি থাকার সূত্রে। একই স্কুল, একই পাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়, হোস্টেল কিংবা একই কর্মস্থল- প্রতিদিনের দেখা-সাক্ষাৎ ও একসঙ্গে সময় কাটানোই সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের বাস্তবতা বদলাতে থাকে। কর্মজীবনের ব্যস্ততা, বিয়ে, সংসার, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব কিংবা চাকরির কারণে অন্য শহর বা দেশে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে বন্ধুত্বের জন্য আগের মতো সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।

Advertisements

বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিশের কাছাকাছি সময়ে মানুষের জীবনযাপন ও অগ্রাধিকারেও বড় পরিবর্তন আসে। বিশ থেকে ত্রিশের কোঠায় ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, জীবনদর্শন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হতে থাকে। ফলে একসময় যাদের সঙ্গে ভাবনা ও জীবনযাত্রার মিল ছিল, সময়ের সঙ্গে তাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
সম্পর্ক ভাঙে, অথচ কেউ জানে না

বন্ধুত্বের বিচ্ছেদের সবচেয়ে কষ্টের দিক হলো—এর বেশিরভাগেরই কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি থাকে না। প্রেমের সম্পর্ক ভাঙলে মানুষ জানে সম্পর্কটি শেষ হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্ব অনেক সময় শেষ হয় নীরবে। প্রথমে প্রতিদিনের কথা কমে যায়। এরপর ফোনে যোগাযোগের বদলে শুধু মেসেজ, তারপর সেটিও অনিয়মিত। একসময় দেখা যায়, প্রিয় মানুষটির সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে, সেটিই মনে করা কঠিন।

মনোবিজ্ঞানে এই অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রিফ’ বা বন্ধুত্ব হারানোর শোক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। মানুষটি জীবিত, কিন্তু তার সঙ্গে আগের সম্পর্কটি আর নেই—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া সহজ হয় না।

অনেকের মনে তখন নানা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—‘আমি কি কোনো ভুল করেছিলাম?’, ‘সে কি ইচ্ছা করেই দূরে সরে গেছে?’, ‘আমাদের বন্ধুত্ব কি তার কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ নয়?’ কোনো স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় এই শূন্যতাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

বন্ধুত্ব হারানো মানেই ব্যর্থতা নয়

তবে সব বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। জীবনের পথ বদলালে সম্পর্কের ধরনও বদলায়। কেউ কেউ একই রকম জীবনযাত্রায় থাকায় পুরোনো বন্ধুত্ব আরও গভীর করতে পারেন। আবার কারও জীবন একেবারে ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তাই বন্ধুত্বে দূরত্ব তৈরি হওয়াকে সবসময় বিশ্বাসঘাতকতা বা সম্পর্কের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। কিছু মানুষ জীবনের দীর্ঘ পথের সঙ্গী হন, কেউ আবার নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য এসে সেই সময়টাকে সুন্দর করে তোলেন।

আবার কি ফিরে পাওয়া যায় পুরোনো বন্ধু?

অনেক ক্ষেত্রেই যায়। কখনো একটি ছোট্ট বার্তাই বহু বছরের দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। ‘তোমার কথা মনে পড়ছিল’—এমন একটি সাধারণ কথাও পুরোনো বন্ধুত্বের দরজা আবার খুলে দিতে পারে।
তবে পুরোনো সম্পর্ককে ঠিক আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। কারণ সময় মানুষকে বদলে দেয়। বদলে যায় জীবন, দায়িত্ব, চিন্তাভাবনা এবং অগ্রাধিকারও। তাই পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরে এলেও সেটি হয়তো আগের মতো হবে না; বরং নতুন বাস্তবতায় নতুন রূপ পাবে।

শেষ পর্যন্ত কিছু বন্ধুত্ব হয়তো জীবনের সঙ্গে থেকে যায়, আর কিছু থেকে যায় স্মৃতিতে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই সম্পর্কের মূল্য কম ছিল। বরং জীবনের একটি বিশেষ সময়ে যে মানুষটি আমাদের হাসিয়েছে, কাঁদার সময় পাশে থেকেছে কিংবা নিঃশর্তভাবে সঙ্গ দিয়েছে—তার গুরুত্ব সময় পেরিয়েও থেকে যায়।






Advertisements
কর্মব্যস্ততাবন্ধুত্ববয়সশৈশবসময়