সন্তান কেন সামাজিক মাধ্যমে আটকে থাকে?

সন্তান কি নিজে থেকেই ফোনে ডুবে থাকে, নাকি তাকে আটকে রাখে সোশ্যাল মিডিয়ার কৌশল? সন্তানকে হয়তো আপনি মাত্র ১০ মিনিটের জন্য ফোন হাতে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখলেন, সেই ১০ মিনিট কখন এক ঘণ্টায় গড়িয়েছে, তা সে যেমন বুঝতে পারেনি, আপনিও টের পাননি। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি ভিডিও, তারপর আরেকটি। একটু স্ক্রল করলেই নতুন পোস্ট, আরও নিচে গেলে আরও নতুন কিছু। যেন শেষই নেই।
এটা কি শুধুই শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশাই এমন, যা ব্যবহারকারীকে যত বেশি সম্ভব সময় আটকে রাখতে চায়? এই প্রশ্ন এখন শুধু অভিভাবকদের নয়, আদালত, গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদেরও।
শেষ নেই স্ক্রলের
একসময় ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্টসংখ্যক পোস্ট দেখার পর নতুন কিছু আর পাওয়া যেত না। এখন সেই অভিজ্ঞতা বদলে গেছে। ব্যবহারকারী যত নিচে স্ক্রল করবেন, ততই নতুন কনটেন্ট সামনে আসবে। ফলে মনে হয়, হয়তো পরের পোস্টটাই সবচেয়ে মজার হবে।
২০২১ সাল পর্যন্ত মেটায় শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আর্তুরো বেজারের মতে, এই অবিরাম স্ক্রলিং ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে নতুন কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করে। প্রতিবার নতুন পোস্ট বা ভিডিও দেখার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত ডোপামিনের প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়। আর সেই প্রত্যাশাই মানুষকে বারবার স্ক্রল করতে উৎসাহিত করে।
অটোপ্লে: না চাইতেও দেখা
ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা নেটফ্লিক্স- প্রায় সব বড় প্ল্যাটফর্মেই এখন অটোপ্লে সুবিধা রয়েছে। একটি ভিডিও শেষ হলেই পরের ভিডিও নিজে থেকেই চালু হয়ে যায়। অনেক সময় ব্যবহারকারী নতুন ভিডিওটি দেখার পরিকল্পনা করেন না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড দেখার পর আগ্রহ তৈরি হয়, তারপর আরও একটি ভিডিও। এভাবেই অজান্তে অনেকটা সময় কেটে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল- ‘পরের ভিডিওতে কী আছে’- এই মনস্তত্ত্বকেই কাজে লাগায় অটোপ্লে।
লাইক, নোটিফিকেশন ও ক্ষণিকের আনন্দ
ফোনে নতুন নোটিফিকেশন এলেই অনেকেরই তা সঙ্গে সঙ্গে দেখার ইচ্ছা হয়। নিজের ছবিতে কতটি লাইক পড়ল, কে মন্তব্য করল, নতুন কোনো বার্তা এসেছে কি না- এসব জানার আগ্রহ মানুষকে বারবার ফোন হাতে নিতে বাধ্য করে। চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট তানভীর শাহরিয়ারের মতে, এই ছোট ছোট ডিজিটাল পুরস্কার শিশুকিশোরদের মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। ফলে তারা বারবার সেই অভিজ্ঞতা ফিরে পেতে চায়।
তার ভাষায়, ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের অভ্যাস, এমনকি আসক্তির রূপও নিতে পারে। এর প্রভাব পড়ে পড়াশোনা, ঘুম, পারিবারিক সময় এবং বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তব জীবনের যোগাযোগের ওপর।
শেষ না হওয়া চক্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে একজন ব্যবহারকারী একটি বিষয় দেখে শেষ করার আগেই সামনে হাজির হয় আরেকটি আকর্ষণীয় কনটেন্ট। একটি কৌতূহল মেটার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় নতুন কৌতূহল। ফলে মনোযোগ এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে ছুটতে থাকে, আর সময়ের হিসাব হারিয়ে যায়।



