বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

গোপনে বিয়ে: শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য

রাসূল-ﷺ-আলীকে-রাঃ-দ্বিতীয়-বিয়ের-অনুমতি-দেন-নি-কেন-2-1200×675

বিয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত একটি পবিত্র অঙ্গীকার। এটি শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; বরং একটি ইবাদত এবং একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। ইসলাম বিয়েকে সহজ, সম্মানজনক ও প্রকাশ্য করার শিক্ষা দিয়েছে।

এর মাধ্যমে সমাজে বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী হয় এবং সন্দেহ, অপবাদ ও অনৈতিকতার পথ বন্ধ হয়। তবে বর্তমান সময়ে নানা কারণে অনেকেই নিজেদের বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। কেউ চাকরি বা সামাজিক অবস্থান হারানোর আশঙ্কায়, কেউ পারিবারিক সমস্যার কারণে, আবার কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ, দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিয়ের বিষয়টি আড়াল করেন। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বিয়ে গোপন রাখা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ?

ইসলাম বিয়েকে এমন একটি সম্পর্ক হিসেবে দেখতে চায়, যা সমাজের কাছে স্বীকৃত, সম্মানজনক ও সন্দেহমুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দিয়ে দাও এবং তোমাদের সৎকর্মপরায়ণ দাস-দাসীদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যা যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত এবং বৈধ সম্পর্ক হিসেবে সমাজে পরিচিত হওয়া উচিত।

Advertisements

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে প্রকাশ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই বিয়ে প্রকাশ করো, মসজিদে সম্পন্ন করো এবং এর উপলক্ষে দফ বাজাও।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৯)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, বিয়ে এমনভাবে সম্পন্ন করা উচিত, যাতে তা গোপন কোনো বিষয় না হয়ে একটি বৈধ ও সম্মানজনক সম্পর্ক হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হয়। কারণ বিয়ে গোপন রাখলে অনেক সময় সন্দেহ, অপবাদ ও সামাজিক বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

তবে বিয়ে বৈধ হওয়া এবং বিয়ে গোপন রাখা—এই দুটি বিষয় এক নয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উভয় পক্ষের সম্মতি, কনের ওয়ালি (অধিকাংশ আলেমের মতে), দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী এবং মোহর নির্ধারণ। এসব শর্ত পূরণ হলে বিয়ে শরিয়তসম্মত হতে পারে।

কিন্তু শরিয়তের শর্ত পূরণ করে বিয়ে সম্পন্ন করার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘদিন তা পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা সমাজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে কারও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রতারণা করা হয় বা মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়, তাহলে তা গুনাহের কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বর্তমানে অনেকেই দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন। ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, তবে এর সঙ্গে ন্যায়বিচারের কঠিন শর্তও যুক্ত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনই যথেষ্ট।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩)

তাই দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হলেও মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা বা অন্যায় উদ্দেশ্যে বিয়ের বিষয় গোপন রাখা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম শুধু বৈধতার দিকটি দেখে না; বরং সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতার ওপরও গুরুত্ব দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)

তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন নিরাপত্তাজনিত কারণ, পারিবারিক জটিলতা বা সাময়িক কোনো বৈধ প্রয়োজনের কারণে—স্বল্প সময়ের জন্য বিয়ের বিষয়টি সীমিত রাখা যেতে পারে। কিন্তু এটিকে স্থায়ীভাবে গোপন রাখা বা প্রতারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলামের উদ্দেশ্য হলো এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বৈধ সম্পর্ক সম্মান পাবে এবং মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। বিয়ে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।

অতএব, শরিয়তের শর্ত পূরণ করে বিয়ে বৈধ হলেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বিয়ে গোপন রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) বিয়ে ঘোষণা ও প্রকাশ করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন, যাতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষিত থাকে, সন্তানদের বংশপরিচয় স্পষ্ট থাকে এবং পারিবারিক জীবনে আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

একজন সচেতন মুসলমানের উচিত বিয়েকে লুকিয়ে না রেখে যথাসম্ভব প্রকাশ করা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করা এবং এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা, যা প্রতারণা, বিভ্রান্তি বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণ হতে পারে।

Advertisements
ইসলামগোপনবিয়েশরিয়ত