ফুটবল ট্রল, নাকি বিষাক্ত উন্মাদনা? সীমারেখা যেখানে টানবেন

বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ- ফুটবলের বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলেই বদলে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেহারা। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), টিকটক কিংবা আড্ডার টেবিল- সবখানেই শুরু হয় ট্রল, মিম আর খুনসুটি। এক দলের সমর্থক অন্য দলকে খোঁচা দেয়, পুরোনো হার-জিতের হিসাব তোলে, আর সেই হাসি-ঠাট্টা অনেকের কাছেই খেলার অন্যতম আনন্দ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ট্রল ঠিক কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য? কখন এটি নিছক বিনোদন থাকে, আর কখন তা বিদ্বেষ, অপমান কিংবা সহিংসতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়?
খেলার সৌন্দর্যই হলো হার-জিত
খেলাধুলার সবচেয়ে স্বাভাবিক সত্য হলো- এখানে জয়ও আছে, পরাজয়ও আছে। প্রতিটি ম্যাচে দুটি দল জিততে পারে না। অথচ অনেক সমর্থক নিজের প্রিয় দলের হারকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন। তখন প্রতিপক্ষকে কটাক্ষ করা কিংবা প্রতিপক্ষের কটাক্ষ সহ্য করতে না পেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একটি ম্যাচের ফল কখনোই একজন মানুষের ব্যক্তিগত মূল্য বা সম্মান নির্ধারণ করে না। কিন্তু আবেগ যখন যুক্তিকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সমস্যা শুরু হয়।
ট্রল কোথায় পর্যন্ত মজা?
বন্ধুদের মধ্যে হালকা খোঁচা, মজার মিম কিংবা পরিসংখ্যানভিত্তিক হাস্যরস- এসব খেলার সংস্কৃতির অংশ। এতে সাধারণত কেউ অপমানিত বোধ করেন না।
কিন্তু ট্রল তখনই সীমা অতিক্রম করে, যখন-
-ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়।
-পরিবার, ধর্ম, জাতি বা দেশের পরিচয় টেনে আনা হয়।
-অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা হয়।
-কাউকে হেয় বা অপদস্থ করার উদ্দেশ্য থাকে।
-ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানিমূলক পোস্ট করা হয়।
এ ধরনের ট্রল আর কৌতুক থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানসিক নির্যাতন।
কেন মানুষ এত উত্তেজিত হয়ে পড়ে?
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ নিজের পরিচয়ের একটি অংশ প্রিয় দল বা ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। তাই দলের জয়কে নিজের জয় এবং পরাজয়কে নিজের পরাজয় মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ সেখানে তাৎক্ষণিক মন্তব্য, শেয়ার এবং ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা মানুষকে অনেক সময় না ভেবেই আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে।
ট্রল থেকে বাস্তবের সংঘর্ষ
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে ট্রলকে কেন্দ্র করে ঝগড়া, মারামারি, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। কখনো চায়ের দোকানে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, কখনো আবার পাড়ার আড্ডায় সামান্য কথাকাটাকাটি বড় সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। একটি অনলাইন পোস্ট বাস্তব জীবনের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ভেঙে যেতে পারে শুধুমাত্র একটি উসকানিমূলক মন্তব্যের কারণে।
শিশু-কিশোরদের ওপর প্রভাব
বড়দের আচরণ দেখে ছোটরাও শেখে। যখন তারা দেখে ফুটবল নিয়ে গালাগালি, বিদ্বেষ কিংবা সহিংসতা স্বাভাবিক ব্যাপার, তখন তারাও একই সংস্কৃতি অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে খেলাধুলা থেকে তারা ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা নয়, বরং প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করার শিক্ষা পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি দায়ী?
পুরোপুরি নয়। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়; ব্যবহারই সবকিছু নির্ধারণ করে। ফেসবুকের অ্যালগরিদম এমন পোস্ট বেশি ছড়িয়ে দেয় যেগুলোতে বেশি প্রতিক্রিয়া আসে। ফলে উত্তেজনাপূর্ণ বা আক্রমণাত্মক পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়। এতে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবেই বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান।
সুস্থ সমর্থক হওয়ার কিছু উপায়:
-হারকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন।
-ট্রল করুন, কিন্তু কাউকে অপমান করবেন না।
-ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলুন।
-উত্তেজিত অবস্থায় মন্তব্য না করাই ভালো।
-শিশুদের সামনে শালীন ভাষা ব্যবহার করুন।
-মনে রাখুন, খেলা শেষ হলেও সম্পর্ক যেন অটুট থাকে।
ফুটবলের আসল শিক্ষা
ফুটবল আমাদের দলগত কাজ, সম্মান, শৃঙ্খলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। মাঠে খেলোয়াড়েরা ম্যাচ শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, জার্সি বিনিময় করেন। অথচ গ্যালারির বাইরে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সমর্থক সেই খেলোয়াড়দের চেয়েও বেশি শত্রুতা তৈরি করেন।
এটি খেলার চেতনার সঙ্গে যায় না।
ফুটবল নিয়ে ট্রল অবশ্যই করা যায়। বরং পরিমিত হাস্যরস খেলাকে আরও আনন্দময় করে তোলে। কিন্তু সেই ট্রল যদি কাউকে অপমান করে, ঘৃণা ছড়ায়, বন্ধুত্ব নষ্ট করে কিংবা মারামারির কারণ হয়, তাহলে সেটি আর বিনোদন নয়- এটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়।
মনে রাখা জরুরি, একটি ম্যাচ ৯০ মিনিটের, কিন্তু একটি সম্পর্ক সারা জীবনের। তাই ফুটবলকে ভালোবাসুন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উপভোগ করুন, কিন্তু কখনোই এমন পর্যায়ে যাবেন না, যেখানে একটি খেলা মানুষের মানবিকতাকেই হারিয়ে দেয়।



