‘আজ রবিবার’—যে নাটক এখনো ফিরিয়ে আনে বাঙ্গালির মুখে হাসি

আজ ১৯ জুলাই। বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনটি ফিরে এলে তার অমর সৃষ্টি নিয়ে নতুন করে কথা ওঠে। উপন্যাস, চলচ্চিত্র কিংবা নাটক—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য স্বাক্ষর। তবে তার সৃষ্টি করা টেলিভিশন নাটকগুলোর মধ্যে ‘আজ রবিবার’ আজও আলাদা করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।
আজ রবিবার শুধু একটি সিটকম নয়, বরং নব্বইয়ের দশকের অসংখ্য মানুষের পারিবারিক স্মৃতি, সাপ্তাহিক আনন্দ আর নির্মল হাসির আরেক নাম।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রথম প্রচারিত হয় ‘আজ রবিবার’। হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও মনির হোসেন জীবনের পরিচালনায় নির্মিত এই ধারাবাহিক খুব দ্রুতই দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। প্রতি সপ্তাহে নাটকটি দেখার জন্য পরিবারের সবাই একসঙ্গে টেলিভিশনের সামনে বসতেন। তখন বিনোদনের এত মাধ্যম ছিল না; তাই ‘আজ রবিবার’ ছিল অনেক পরিবারের সপ্তাহের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সময়।

নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছে ঢাকার একটি খামখেয়ালি অথচ ভালোবাসায় ভরা পরিবারকে ঘিরে। পরিবারের কর্তা দাদাজান, তার দুই সামাজিকভাবে অদক্ষ ছেলে, দুই নাতনি, একজন বোর্ডার, গৃহকর্মী ও পরিচারিকাকে নিয়ে এগিয়েছে কাহিনি। গল্পের শুরু হয় ছোট নাতনি কঙ্কাকে দিয়ে। দর্শকের সঙ্গে তার সরাসরি কথোপকথন নাটকটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। কঙ্কা ও তার বড় বোন তিতলি—দুজনেই গোপনে ভালোবাসে বোর্ডার আনিসকে। কিন্তু বইয়ের পোকা আনিস যেন ভালোবাসার ভাষাই বোঝে না।
অন্যদিকে স্থপতি জামিলের জীবনে আসে মীরা, যিনি তার সন্তানদের গৃহশিক্ষিকা। তাকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন আবেগ, দ্বন্দ্ব ও হাস্যরস। আবার ফরহাদ চরিত্রের উপস্থিতি, ‘বেকার ভাই’-এর ছায়া এবং শেষ দিকে হিমুকে ঘিরে ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রজগত যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে ওঠে।

এই নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর অসাধারণ অভিনয়শিল্পীরা। আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, শীলা আহমেদ, ফারুক আহমেদ, আসাদুজ্জামান নূর ও সুবর্ণা মুস্তফাসহ প্রত্যেকেই নিজেদের চরিত্রকে এমন স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, তাদের আর অভিনয়শিল্পী মনে হতো না—মনে হতো তারা যেন আমাদেরই পরিবারের মানুষ।
হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্যের জাদু ছিল জীবনের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোকে অসাধারণ করে তোলার ক্ষমতায়। তার সংলাপে ছিল নির্মল হাসি, সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ, ভালোবাসা, অভিমান এবং মধ্যবিত্ত জীবনের পরিচিত উষ্ণতা। ‘আজ রবিবার’-এর অনেক সংলাপ পরবর্তীকালে জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, যা আজও দর্শকের মুখে মুখে ফেরে।

সময়ের সঙ্গে টেলিভিশনের পর্দা বদলেছে, বদলেছে দর্শকের অভ্যাসও। কিন্তু ‘আজ রবিবার’-এর আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। বরং নতুন প্রজন্মও ইউটিউব ও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে নাটকটি দেখে আবিষ্কার করছে এক ভিন্ন সময়ের বাংলাদেশকে—যেখানে হাসি ছিল সহজ, সম্পর্ক ছিল আন্তরিক, আর গল্পগুলো ছিল একেবারে নিজের জীবনের মতো।
হুমায়ূন আহমেদ একবার বলেছিলেন, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
‘আজ রবিবার’ সেই কঠিন কাজটিই অনায়াসে করে দেখিয়েছিল। তাই ১৯ জুলাই, তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই নাটককে স্মরণ করা মানে শুধু একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিককে স্মরণ করা নয়; বরং এমন একজন গল্পকারকে শ্রদ্ধা জানানো, যিনি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে অসাধারণ শিল্পে পরিণত করেছিলেন। যতদিন বাংলা নাটকের ইতিহাস লেখা হবে, ততদিন ‘আজ রবিবার’ থাকবে নির্মল হাসি, পারিবারিক ভালোবাসা আর নস্টালজিয়ার এক চিরসবুজ নাম হয়ে।



