বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
নারী

গ্রাফিক ডিজাইনের ‘মুকুটহীন রানী’ হয়ে ওঠার গল্প

interview_1281

গ্রাফিক ডিজাইন একসময় ছিল কেবল দক্ষ পেশাদারদের কাজ। জটিল সফটওয়্যার, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং ব্যয়বহুল লাইসেন্স ছাড়া এই জগতে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেই বাস্তবতাই বদলে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোক্তা মেলানি পারকিন্স। তাঁর সহপ্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম ক্যানভা ডিজাইনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে কয়েকটি ক্লিকেই একজন নতুন ব্যবহারকারীও আকর্ষণীয় পোস্টার, প্রেজেন্টেশন, সিভি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন।

১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে জন্ম নেওয়া মেলানির মা ছিলেন একজন শিক্ষক এবং বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে ওঠেন। ফিগার স্কেটিংয়ের কঠোর অনুশীলন তাঁকে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের শিক্ষা দেয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই নিজের হাতে স্কার্ফ তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন, যা তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ চালাতে তিনি শিক্ষার্থীদের ফটোশপ ও ইনডিজাইনের মতো সফটওয়্যার শেখাতেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, প্রচলিত ডিজাইন সফটওয়্যার সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল। এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনা, যেখানে ডিজাইন হবে সহজ, দ্রুত এবং সবার নাগালের মধ্যে।
২০০৭ সালে বর্তমান স্বামী ক্লিফ ওব্রেখটকে সঙ্গে নিয়ে তিনি “ফিউশন বুকস” নামে একটি অনলাইন ইয়ারবুক ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। সীমিত সম্পদ নিয়েও উদ্যোগটি সফল হয় এবং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সাফল্য তাঁকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়।

বিশ্বব্যাপী ব্যবহারযোগ্য একটি ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল বড় বিনিয়োগ। কিন্তু একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁকে বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হয়। শতাধিক বিনিয়োগকারী তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও তিনি থেমে যাননি। নতুন নতুন উপায়ে নিজের ধারণা তুলে ধরে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেন।

গুগলের সাবেক প্রকৌশলী ক্যামেরন অ্যাডামস দলে যোগ দেওয়ার পর ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ক্যানভা। সহজ ড্র্যাগ-অ্যান্ড-ড্রপ ইন্টারফেস এবং ব্যবহারবান্ধব ডিজাইনের কারণে অল্প সময়েই এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে প্রতি মাসে ১৭০ মিলিয়নের বেশি মানুষ ক্যানভা ব্যবহার করছেন। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যও কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

Advertisements

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন মেলানি পারকিন্স। “ক্যানভা ফর এডুকেশন” কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যানভার প্রিমিয়াম সুবিধা বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি শিক্ষার্থী ডিজিটাল শিক্ষায় নতুন সুযোগ পাচ্ছেন।

শুধু ব্যবসা নয়, সমাজের প্রতিও নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন মেলানি ও ক্লিফ। ২০২১ সালে তাঁরা “দ্য গিভিং প্লেজ”-এ স্বাক্ষর করে তাঁদের সম্পদের বড় একটি অংশ মানবকল্যাণে দান করার অঙ্গীকার করেন, যা প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ। বাংলাদেশেও ক্যানভার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট নির্মাতারা প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। বাংলা ফন্ট, স্থানীয় উৎসবভিত্তিক টেমপ্লেট এবং সহজ ব্যবহারের সুবিধার কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্যানভা সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

একজন তরুণীর ছোট্ট একটি সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা আজ বিশ্বের কোটি মানুষের সৃজনশীলতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। মেলানি পারকিন্স প্রমাণ করেছেন, প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

Advertisements
অস্ট্রেলিয়াগ্রাফিক ডিজাইনমেলানি পারকিন্সরানী