বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

সবুজের মাঝে হাঁটা কেন স্বাস্থ্যকর? জেনে নিন উপকারিতা

images (17)

ব্যস্ত নগরজীবন, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে কাজ এবং প্রতিদিনের মানসিক চাপ আমাদের শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সুস্থ থাকতে নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা পরিবেশে গাছপালা, সবুজ মাঠ, পার্ক কিংবা নদীর ধারে হাঁটলে শুধু শরীর নয়, মনও ভালো থাকে। নিয়মিত এমন পরিবেশে হাঁটার অভ্যাস হৃদ্‌স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং ঘুমের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম প্রয়োজন। প্রতিদিন মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট প্রকৃতির মাঝে হাঁটলেও শরীর ও মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মানসিক চাপ উদ্বেগ কমায়

প্রকৃতির মাঝে হাঁটার সবচেয়ে বড় উপকার হলো মানসিক প্রশান্তি। সবুজ গাছপালা, পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ কিংবা বৃষ্টির গন্ধ আমাদের মস্তিষ্ককে স্বস্তি দেয়। এসব প্রাকৃতিক উপাদান কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও মানসিক ক্লান্তি ধীরে ধীরে কমে যায়।

Advertisements

যুক্তরাজ্যে ২০ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত ১২০ মিনিট প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটান, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে।

হৃদ্যন্ত্র শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য উপকারী

‘ইকোফিজিওলজি’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, খোলা পরিবেশে হাঁটলে হৃদ্‌স্পন্দন স্বাভাবিক থাকে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে। বিশুদ্ধ বাতাসে হাঁটার ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায়, যা হৃদ্‌যন্ত্রকে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সহায়তা করে।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়

প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, গাছপালা থেকে নির্গত কিছু প্রাকৃতিক উপাদান শরীরের ‘ন্যাচারাল কিলার সেল’-এর কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে। এই কোষগুলো ভাইরাস ও ক্ষতিকর কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

জাপানে পরিচালিত ‘ফরেস্ট বাথিং’ বা বনভ্রমণ বিষয়ক গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে, বনাঞ্চলে সময় কাটানো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে সহায়ক।

হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে

প্রকৃতির মাঝে হাঁটলে শরীরের এন্ডোক্রাইন সিস্টেম সক্রিয় হয়। এতে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস-সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রা কমে। ফলে শরীর ও মন দুটোই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। নিয়মিত প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলে মন ভালো রাখার হরমোন সেরোটোনিন ও এন্ডোরফিনের নিঃসরণও বাড়তে পারে।

ঘুমের মান উন্নত করে

যাদের রাতে সহজে ঘুম আসে না বা ঘুম বারবার ভেঙে যায়, তাদের জন্যও প্রকৃতির মাঝে হাঁটা উপকারী হতে পারে। দিনের আলো ও খোলা পরিবেশ শরীরের জৈবিক ঘড়িকে (বডি ক্লক) স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে রাতে গভীর ও আরামদায়ক ঘুম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়

প্রকৃতির মধ্যে হাঁটলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা উন্নত হতে পারে। দীর্ঘ সময় মানসিক কাজের পর কিছুক্ষণ সবুজ পরিবেশে হাঁটলে মস্তিষ্ক নতুন করে সতেজ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী ও অফিসে দীর্ঘসময় কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী।

হজম বিপাকক্রিয়া উন্নত হয়

খাবারের পর হালকা হাঁটাহাঁটি হজমে সহায়তা করে। আর যদি সেই হাঁটা হয় খোলা পরিবেশে, তাহলে শরীর আরও স্বস্তি অনুভব করে। নিয়মিত হাঁটার ফলে বিপাকক্রিয়া উন্নত হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে।

ভিটামিন ডিএর প্রাকৃতিক উৎস

সকালের মৃদু রোদে হাঁটলে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। এই ভিটামিন হাড় ও দাঁত মজবুত রাখতে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে এবং পেশির কার্যকারিতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সামাজিক সম্পর্কও মজবুত হয়

পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে বা খোলা পরিবেশে হাঁটলে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ে। একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি যেমন পাওয়া যায়, তেমনি সম্পর্কও আরও দৃঢ় হয়।

কীভাবে হাঁটবেন?

১। প্রতিদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট খোলা পরিবেশে হাঁটার চেষ্টা করুন।

২। পার্ক, বাগান, লেকপাড়, নদীর ধারে বা গাছপালায় ঘেরা এলাকায় হাঁটা বেশি উপকারী।

৩। হাঁটার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করে চারপাশের প্রকৃতি উপভোগ করুন।

৪। আরামদায়ক জুতা ও হালকা পোশাক পরুন।

৫। সকালে বা বিকেলে হাঁটা সবচেয়ে ভালো।

৬। গরমের দিনে সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি রাখুন।

৭। হাঁটার সময় গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করুন, এতে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ে।

নিয়মিত হাঁটা সুস্থ জীবনের অন্যতম সহজ ও কার্যকর অভ্যাস। আর সেই হাঁটা যদি হয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে, তাহলে এর সুফল আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। মানসিক চাপ কমানো থেকে শুরু করে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, ঘুমের উন্নতি এবং মনকে প্রফুল্ল রাখার মতো নানা উপকার পাওয়া যায়। তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা সময় সবুজের মাঝে হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে তা দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মন—উভয়ের জন্যই ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।

Advertisements
উপকারিতাসবুজস্বাস্থ্যহাঁটা