এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে বন্যা-ভূমিধস ও রোগের ঝুঁকি বাড়ছে

এল নিনোর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশসহ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে আগামী কয়েক সপ্তাহে বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ, খরা এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)।
সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরসি জানিয়েছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে চলমান মৌসুমি বৃষ্টির কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
আইআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধস দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। জুলাই মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সংস্থাটি বলছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা আরও বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে ঝুঁকি
আইআরসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, পাকিস্তানে এ বছর মৌসুমি বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলার কারণে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পূর্ব আফ্রিকায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইআরসি। সংস্থাটির মতে, সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের খরা, খাদ্যসংকট ও বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটির প্রায় ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
আইআরসি জানায়, ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং বহু শহর ও জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। কারণ, দীর্ঘ খরা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে দেশটির মানুষ আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
এ ছাড়া ইথিওপিয়ার উঁচু এলাকায় ভারী বৃষ্টি এবং সোমালিয়ার দেইর মৌসুমের বৃষ্টির কারণে দেশটির প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা ও পানিবাহিত ডায়রিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কেনিয়া ও উগান্ডায়ও সতর্কতা
আইআরসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালজুড়ে কেনিয়ায় এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে বছরের শেষ দিকে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো সক্রিয় করেছে।
উগান্ডাতেও বছরের শেষ দিকে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে এল নিনো চক্রের সময় দেশটিতে ৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আইআরসির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, একই সময়ে একাধিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যেসব জনগোষ্ঠীর নতুন কোনো দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা কম, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই প্রস্তুতি নেওয়া মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বেশি কার্যকর।
তিনি আরও বলেন, আগাম সতর্কতা, নগদ সহায়তা এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা আগে থেকেই নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশে কেন এত বৃষ্টি?
গত ৫ জুলাই থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই মাসিক মোট বৃষ্টির প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, এবার নিম্নচাপটি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়ায় এর গতিপথ কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের নিম্নচাপ খুলনা ও বরিশাল হয়ে মধ্যাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। তবে এবার এটি চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে বেশি জলীয় বাষ্প নিয়ে গেছে, ফলে ওই অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, এল নিনোর একটি বৈপরীত্য হলো—এটি একদিকে তাপমাত্রা বাড়ায়, আবার অন্যদিকে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। বর্তমান বৃষ্টিপাতকে এল নিনোর এমনই একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এর আগে সতর্ক করেছিল, চলতি বছরের গ্রীষ্ম এল নিনোর প্রভাবে তুলনামূলক বেশি উষ্ণ হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই জলবায়ু প্রবাহের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়।
এদিকে, চলতি বৃষ্টিতে দেশের এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি কৃষি খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।



