নিজেকে ভালোবাসার নতুন ভাষা: অ্যাস্থেটিক চিকিৎসায় নারীদের আগ্রহ

একসময় সৌন্দর্যচর্চা বলতে বোঝানো হতো ঘরোয়া যত্ন, বিউটি স্যালন, ফেসিয়াল কিংবা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের সাজসজ্জা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সৌন্দর্যচর্চার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে। ত্বকের যত্ন, বয়সের ছাপ কমানো, মুখের গঠন আরও আকর্ষণীয় করে তোলা—এসব বিষয় নিয়ে নারীদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার নগরজীবনে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা।

রাজধানীর ব্যস্ত এলাকাগুলোতে এখন কাচে ঘেরা আধুনিক অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়ছে। ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা মিলছে এমন সব প্রতিষ্ঠানের, যেখানে ত্বকের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বোটক্স, ফিলার, লেজার চিকিৎসাসহ নানা ধরনের নান্দনিক সেবা দেওয়া হচ্ছে।
উদ্দেশ্য নিজেকে অন্য কারও মতো করে তোলা নয়, বরং নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা ধীরে ধীরে গোপন কোনো বিষয় না থেকে শহুরে নারীদের জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠছে।
বিউটি স্যালন থেকে অ্যাস্থেটিক ক্লিনিক
একসময় বিউটি স্যালন ছিল নারীদের আত্মপরিচর্যার প্রধান জায়গা। চুলের যত্ন, ফেসিয়াল, ভ্রু সাজানো কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানের সাজ—এসবই ছিল সৌন্দর্যচর্চার মূল অংশ। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা।
বোটক্স, ফিলার, লেজার ট্রিটমেন্ট কিংবা পিআরপি (নিজের রক্ত থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার করে ত্বকের যত্ন) এখন অনেক নারীর পরিচিত শব্দ। বয়সের ছাপ কমানো, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানো কিংবা মুখের নির্দিষ্ট অংশের গঠন পরিবর্তনের জন্য এসব চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে।
বোটক্সের মাধ্যমে মুখের নির্দিষ্ট পেশি সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়, ফলে বলিরেখা কম দৃশ্যমান হতে পারে। ফিলারের মাধ্যমে ঠোঁট, গাল বা চোয়ালের ভরাট ভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। আর পিআরপি চিকিৎসায় নিজের রক্ত থেকে বিশেষ উপাদান সংগ্রহ করে ত্বকে প্রয়োগ করা হয়।
সৌন্দর্যের পেছনে নতুন অর্থনীতি
বাংলাদেশে সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা খাতের বাজার বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যেই অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা দ্রুত বিকাশমান একটি খাতে পরিণত হয়েছে।
একসময় এসব চিকিৎসা শুধুই ধনী বা তারকাদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এখন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, তরুণ পেশাজীবী এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, এসব চিকিৎসার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো সময়ের স্বল্পতা। অস্ত্রোপচার ছাড়া করা অনেক চিকিৎসা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করা যায়। ফলে কর্মজীবী নারীরা দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও এসব সেবা নিতে পারছেন।
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসক তাসনিম অর্পার মতে, বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যেও এসব সেবার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীরাও নিয়মিত ত্বকের যত্নের অংশ হিসেবে এসব চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সৌন্দর্যের ধারণা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বড়। নিখুঁত ত্বক, তারুণ্যময় চেহারা এবং নির্দিষ্ট ধরনের সৌন্দর্য এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত প্রদর্শিত হচ্ছে।
কোরিয়ান সৌন্দর্যচর্চার প্রভাবও বাংলাদেশে বাড়ছে। কোরিয়ান নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মতো পরিষ্কার ত্বক ও সুঠাম মুখাবয়ব অনেকের কাছে সৌন্দর্যের নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।
আগে অ্যাস্থেটিক ক্লিনিকের পরিচিতি মূলত পরিচিত মানুষের পরামর্শের মাধ্যমে ছড়াত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি, ভিডিও ও প্রচারণার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান সহজেই নতুন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

নিজেকে ভালো লাগার চেষ্টা, নাকি সামাজিক চাপ?
তবে অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে—নারীরা কি নিজের জন্য এসব করছেন, নাকি সমাজের তৈরি সৌন্দর্যের চাপ থেকে?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের চেহারা নিয়ে যত্ন নেওয়া স্বাভাবিক। কেউ যদি নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য অ্যাস্থেটিক চিকিৎসা নেন, সেটি ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন একজন মানুষের আত্মমর্যাদা পুরোপুরি অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকারের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তাঁর ভাষায়, “কেউ যদি নিজের ভালো লাগার জন্য কোনো চিকিৎসা নেন, সেটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু শুধু অন্যের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য নিজেকে বদলানোর চাপ তৈরি হলে সেটি উদ্বেগের বিষয়।”
নিরাপত্তা ও সচেতনতার প্রয়োজন
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার জনপ্রিয়তা বাড়লেও এর নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বোটক্স, ফিলার বা ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসা অবশ্যই প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া উচিত।
কারণ এসব চিকিৎসা দেখতে সহজ মনে হলেও ভুল পদ্ধতি বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে নয়, চিকিৎসকের যোগ্যতা, ক্লিনিকের মান এবং ব্যবহৃত পণ্যের নিরাপত্তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার নারীদের বদলে যাওয়া সৌন্দর্য ভাবনা
অ্যাস্থেটিক চিকিৎসার বিস্তার শুধু একটি নতুন ব্যবসার উত্থান নয়, এটি নারীদের নিজেদের শরীর, বয়স ও সৌন্দর্য সম্পর্কে বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন।
আজকের নারী শুধু অন্যের চোখে সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, নিজের কাছে আরও আত্মবিশ্বাসী অনুভব করার জন্যও নিজের যত্ন নিতে চান। সেই পরিবর্তিত মানসিকতার সঙ্গেই এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকার অ্যাস্থেটিক সৌন্দর্যচর্চার নতুন অধ্যায়।
তথ্যসূত্রঃটিবিএস


