স্টেডিয়ামজুড়ে ‘রো, রো’ ধ্বনি—কী এই ভাইকিং রো?

বিশ্বকাপ মানেই শুধু রোমাঞ্চকর ম্যাচ বা চোখধাঁধানো গোল নয়, বরং নানা ধরনের উদযাপনও দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তালিকায় নতুন সংযোজন নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’। মাঠে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি গ্যালারিতে হাজারো সমর্থকের একসঙ্গে বৈঠা চালানোর ভঙ্গিতে উদযাপন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। নরওয়ের প্রাচীন ভাইকিং ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত এই আয়োজন ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

‘ভাইকিং রো’ আসলে কী?
‘ভাইকিং রো’ এমন এক ধরনের সমবেত উদযাপন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা পাশাপাশি বসে শরীর সামনে-পেছনে দুলিয়ে বৈঠা চালানোর মতো অঙ্গভঙ্গি করেন। একজন ড্রামার ছন্দ নির্ধারণ করেন, আর নির্দিষ্ট বিরতিতে সবাই একসঙ্গে উচ্চারণ করেন—‘রো’। পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
ম্যাচ চলাকালীন কিংবা গোলের পর—যেকোনো সময়ই সমর্থকেরা এই উদযাপনে অংশ নেন। হাজারো মানুষের একসঙ্গে একই ছন্দে দোলার দৃশ্য স্টেডিয়ামে এক অনন্য আবহ তৈরি করে।
ভাইকিং ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক
এই উদযাপনের মূল অনুপ্রেরণা নরওয়ের ঐতিহাসিক ভাইকিং সংস্কৃতি। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী—প্রায় ৮০০ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ‘ভাইকিং যুগ’ বলা হয়। সে সময় নরওয়ে ছিল ভাইকিংদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দক্ষ নাবিক, অভিযাত্রী ও যোদ্ধা হিসেবে ভাইকিংরা ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপথে অভিযান চালিয়েছিল। তাদের দীর্ঘ নৌযাত্রা এবং বৈঠা চালানোর দৃশ্যই আজকের ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের প্রতীকী ভিত্তি।
নরওয়েজিয়ানদের কাছে এটি শুধু একটি উদযাপন নয়; বরং তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকও।
কে শুরু করেছিলেন ‘ভাইকিং রো’?
এই উদযাপনের সূচনাকারী হিসেবে পরিচিত নরওয়ের জনপ্রিয় ফুটবল সমর্থক ওলে ফ্রয়স্তাদ। ২০২৬ সালের মার্চে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তিনি প্রথম সমর্থকদের নিয়ে ‘ভাইকিং রো’ শুরু করেন। শুরু থেকেই এটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তবে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরই উদযাপনটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমীরাও এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জনপ্রিয়তার কারণে ওলে ফ্রয়স্তাদ এখন ‘মিস্টার রো রো’ নামেও পরিচিত।

খেলোয়াড়রাও যোগ দিয়েছেন উদযাপনে
শুরুতে এটি ছিল শুধুই সমর্থকদের উদযাপন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ের জাতীয় দলের ফুটবলাররাও এতে অংশ নিতে শুরু করেন।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নকআউট পর্বের ম্যাচের আগে এবং শেষ ষোলো নিশ্চিত হওয়ার পর দলের তারকা ফরোয়ার্ড আর্লিং হাল্যান্ড ও অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড সতীর্থদের নিয়ে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে নেতৃত্ব দেন। খেলোয়াড় ও সমর্থকদের একসঙ্গে এই অংশগ্রহণ নরওয়ে দলের ঐক্য ও পারস্পরিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কী বলছেন উদযাপনের প্রবর্তক?
সম্প্রতি ইনসাইড ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওলে ফ্রয়স্তাদ বলেন, ‘হাজারো মানুষকে একই ছন্দে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি করতে দেখা অসাধারণ অনুভূতি। এটি সবাইকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে। আমি কখনো ভাবিনি ‘ভাইকিং রো’ এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠবে’।
কেন এত জনপ্রিয়?
‘ভাইকিং রো’-এর জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এটি সহজ, যেকোনো বয়সের মানুষ অংশ নিতে পারেন এবং পুরো স্টেডিয়ামকে একসঙ্গে যুক্ত করে। পাশাপাশি এটি নরওয়ের ঐতিহ্যকে আধুনিক ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে দারুণভাবে মিলিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপে নরওয়ের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে এই উদযাপন।
নরওয়ে ফুটবলের অফিসিয়াল সমর্থকগোষ্ঠী ইতোমধ্যেই ‘ভাইকিং রো’কে তাদের আনুষ্ঠানিক উদযাপন হিসেবে গ্রহণ করেছে। বিশ্বকাপের সুবাদে এখন শুধু নরওয়েতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যেও এই উদযাপন ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্টগুলোতেও ‘ভাইকিং রো’ নরওয়ের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।



