বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
বিবিধ

পথশিশুদের আবাসন, শিক্ষা ও পুনর্বাসনে ৪২০ কোটি টাকার উদ্যোগ

images (27)

দেশজুড়ে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা, পুনর্বাসন এবং দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে প্রায় ৪২০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন প্রকল্প’ শীর্ষক এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, চলতি বছর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ৪২০ কোটি টাকার পুরো অর্থই সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যে অনুমোদনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।

পরিবারে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

প্রকল্পের আওতায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ৬ হাজার ৬০০ শিশুকে পুনরায় তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া ১ হাজার ৯০০ পথশিশুর জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে এবং ৪ হাজার ৫০০ শিশুকে আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে।

Advertisements

শুধু আশ্রয় বা শিক্ষাই নয়, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে। শেল্টার হোমে থাকা শিশুদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। যেসব শিশু উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তাদের এককালীন আর্থিক সহায়তা অথবা সমমূল্যের প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম দেওয়া হবে।

এ ছাড়া ৫ হাজার ৭০০ পথশিশুকে স্বাবলম্বী করতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ৫ হাজার ৫০০ শিশু বা তাদের পরিবারকে শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা (কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার) দেওয়া হবে, যাতে তারা শিশুকে আবার রাস্তায় পাঠাতে বাধ্য না হয়।

কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী উপযুক্ত উপকারভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে।

৩১ জেলায় বাস্তবায়ন হবে প্রকল্প

ডিপিপি অনুযায়ী, দেশের ৩১টি জেলা, ৩৪টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৮টি পৌরসভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় থাকবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ দেশের বড় বড় নগর এলাকা।

এ ছাড়া সাভার, গজারিয়া, সন্দ্বীপ, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, নোয়াখালী সদর, হাইমচর, বরিশাল সদর, মেহেন্দিগঞ্জ, উজিরপুর, মুলাদী, ভোলা সদর, লালমোহন, মনপুরা, তজুমুদ্দিন, পিরোজপুর সদর, পটুয়াখালী সদর, বাউফল, বরগুনা সদর, আমতলী, পাথরঘাটা, খুলনা সদর, হবিগঞ্জ সদর, সুনামগঞ্জ সদর, রাজশাহী সদর, নাটোর সদর, রংপুর সদর, গাইবান্ধা সদর, ভালুকা, ভৈরব ও নেত্রকোণা সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন পৌরসভাও এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ডিপিপিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের পথশিশু বিষয়ক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে যেসব এলাকায় পথশিশুর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিবারে পুনর্মিলন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম সারা দেশেই পরিচালিত হবে।

নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, উন্মুক্ত স্কুল ও কাউন্সেলিং সেবা

প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৯টি নতুন শেল্টার হোম, ৩টি ট্রানজিট হোম এবং ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল স্থাপন ও পরিচালনা করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

এ ছাড়া ১৫টি কাউন্সেলিং বুথ স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে পথশিশুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে একটি বেইসলাইন জরিপ পরিচালনা, বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ তৈরি এবং প্রতিটি শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের জন্য সমন্বিত সেবা প্রদান সহজ হয়।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের পুনরায় পরিবারে ফিরিয়ে আনতে পৃথক নীতিমালা ও গাইডলাইনও প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি বিত্তশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে শিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। সরকারি সহায়তায় পালক পরিবার (ফস্টার ফ্যামিলি) নির্বাচন করে নির্দিষ্টসংখ্যক শিশুর পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতা

আশ্রয়কেন্দ্র ও উন্মুক্ত স্কুলে থাকা শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বাজার উপযোগী কারিগরি ও আয়বর্ধক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করা হবে।

ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য ১২৫টি ইউনিয়নে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। এছাড়া বিলবোর্ড, পোস্টার, লিফলেট, বুকলেট, স্টিকার, নিউজলেটার, পথনাটক, জারি, সারি, গম্ভীরা, মূকাভিনয়, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশু অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো হবে।

কেন শিশুরা পথে নামে

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দারিদ্র্য, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ ও সহিংসতার কারণে বহু শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরমুখী হয়।

এসব শিশু ফুটপাত, পার্ক, বাস ও রেলস্টেশন, সেতুর নিচে এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করে। জীবিকার তাগিদে তারা ময়লা সংগ্রহ, হকারি, হোটেলে কাজ, গাড়ি পরিষ্কার, কুলিগিরি কিংবা ভিক্ষাবৃত্তির মতো কাজে জড়িয়ে পড়ে। অনেক শিশু আবার মাদক পরিবহন, চুরি, পকেটমার কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে যায়।

ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রাজিল, ভারত ও সিয়েরা লিওনের সফল পুনর্বাসন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই এই প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বেশিরভাগ পথশিশুই পরিবারে ফিরতে চায়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু দিনে রাস্তায় কাজ করলেও রাতে পরিবারে ফিরে যায়। ১৯ শতাংশ শিশু স্থায়ীভাবে রাস্তায় বসবাস করে, ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে রাস্তায় থাকে এবং ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অন্য পরিবারের কাছে ফিরে যায়।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পথশিশুর বাবা-মা জীবিত এবং ৯১ দশমিক ২ শতাংশ শিশু আবার পরিবারের কাছে ফিরতে চায়। তবে ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী নয়।

ডিপিপিতে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধাই শিশুদের বাড়ি ছাড়ার প্রধান কারণ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের কারণে বাড়ি ছেড়ে শহরে আসে। সহজ যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথ ব্যবহার করে অনেক শিশু ঢাকায় এসে পরে পথশিশুদের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

সরকারের আশা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি ২৪ হাজার ৮৫০ জন এবং পরোক্ষভাবে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১৫০ জনসহ মোট প্রায় ৫ লাখ শিশু উপকৃত হবে এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Advertisements
আবাসনপথশিশুপুনর্বাসন