বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
নারী

মাত্র ৭ সেকেন্ডেই মুছে যায় সব স্মৃতি! তবু কীভাবে বেঁচে আছেন এই নারী?

images

ভাবুন তো, এইমাত্র কারও সঙ্গে পরিচয় হলো। দু’জন মিলে গল্পও করলেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই সেই মানুষটির মুখ, নাম, এমনকি কথোপকথনের স্মৃতিটুকুও আর মনে নেই। প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন, প্রতিটি পরিচয় যেন প্রথমবার। জাপানের জুনকো মিজুতার জীবন ঠিক এমনই।

বাইরে থেকে তাঁকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে তিনি একটি বিরল স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি হাসেন, কথা বলেন, মানুষের সঙ্গে মিশে যান। কিন্তু নতুন কোনো স্মৃতি তাঁর মস্তিষ্কে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয় না। তাই প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে যেন নতুন করে শুরু হয়।

স্মৃতি হারানোর শুরু

২০০০ সালের শুরুর দিকে জুনকো আক্রান্ত হন হারপিস সিমপ্লেক্স এনসেফালাইটিস নামের একটি গুরুতর ভাইরাসজনিত মস্তিষ্কের সংক্রমণে। রোগটি তাঁর মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোর ক্ষতি করে, যেগুলো নতুন স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণের জন্য দায়ী।

Advertisements

এরপর থেকেই তিনি অ্যান্টেরোগ্রেড অ্যামনেশিয়া নামের এক বিরল অবস্থায় বসবাস করছেন। অর্থাৎ অসুস্থ হওয়ার আগের অনেক স্মৃতি তাঁর মনে থাকলেও নতুন কোনো ঘটনা বা অভিজ্ঞতা দীর্ঘ সময়ের জন্য মনে রাখতে পারেন না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন তথ্য তিনি প্রায় সাত সেকেন্ড পর্যন্ত মনে রাখতে সক্ষম হন।

খাতাই তাঁর দ্বিতীয় মস্তিষ্ক

অধিকাংশ মানুষ স্মৃতির ওপর ভর করেই জীবন চালায়। কিন্তু জুনকোর ভরসা একটি খাতা আর একটি কলম। কার সঙ্গে দেখা হলো, কী কথা হলো, কোথায় যেতে হবে, কখন ওষুধ খেতে হবে- সবকিছু তিনি সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখেন। কারণ কয়েক সেকেন্ড পরেই সেসব তাঁর মনে থাকে না। বারবার সেই নোট পড়ে তিনি বুঝে নেন তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন এবং এরপর কী করতে হবে। এক অর্থে, খাতাটিই তাঁর বাহ্যিক স্মৃতিশক্তি।

পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি

জুনকোর জীবন শুধু তাঁর নিজের লড়াইয়ের গল্প নয়, এটি তাঁর পরিবারেরও গল্প।
পরিবারের সদস্যরা ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিদিন তাঁকে একই কথা বারবার মনে করিয়ে দেন। পরিচর্যাকারীরা নোট, রুটিন ও নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁকে দৈনন্দিন কাজগুলো সম্পন্ন করতে সাহায্য করেন। স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী হলেও ভালোবাসা, যত্ন আর সহযোগিতা তাঁকে প্রতিদিন এগিয়ে নিয়ে যায়।

ক্যামেরায় বন্দি এক অসাধারণ জীবন

জুনকোর জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র Ever Vanishing Present। সেখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে স্মৃতি হারিয়েও একজন মানুষ নিয়ম, অভ্যাস এবং আশপাশের মানুষের সহায়তায় নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারেন।

তথ্যচিত্রটি শুধু একটি রোগের গল্প নয়; এটি মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, সম্পর্কের শক্তি এবং জীবনের প্রতি অবিচল ইচ্ছার গল্প।

স্মৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, স্মৃতিই আমাদের পরিচয় তৈরি করে। আমরা কে, কাদের ভালোবাসি, কোথায় থাকি, কী শিখেছি- সবকিছুর ভিত্তি স্মৃতি। জুনকো মিজুতার জীবন আমাদের সেই সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। স্মৃতি হারিয়ে গেলেও মানুষ বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে নিতে পারে। প্রযুক্তি, অভ্যাস, পরিবার এবং অদম্য মানসিক শক্তি মিলেই গড়ে ওঠে সেই পথ।

জুনকো মিজুতার গল্প কেবল একটি বিরল রোগের গল্প নয়। এটি মানুষের অভিযোজনক্ষমতা, সাহস এবং আশার গল্প। প্রতিদিন, প্রতিটি কয়েক সেকেন্ড পরপর তাঁর পৃথিবী যেন নতুন করে শুরু হয়। তবুও তিনি থেমে যান না। হয়তো এ কারণেই তাঁর জীবন আমাদের শেখায়- স্মৃতি মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু বেঁচে থাকার ইচ্ছাই মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

Advertisements
নারীস্মৃতিহারপিস সিমপ্লেক্স এনসেফালাইটিস