বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ছয় মাসে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক, বাড়ছে কারখানা বন্ধের প্রবণতা

IMG_2108

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে আর্থিক সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং সহায়তার অভাবে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই এখনো বকেয়া বেতন-ভাতা ও আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাননি।

গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ওয়াশিং অ্যান্ড ডায়িং এবং ইউনিক ডিজাইনার্স কারখানা গত ১৬ জুন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। দুটি কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। আর্থিক সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ হলেও শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা ও ক্ষতিপূরণ এখনো পরিশোধ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; প্রতি মাসেই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এদের অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক। শিল্প পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের আটটি শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানা থেকে ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে সাভার-আশুলিয়ার ৩৫টি, গাজীপুরের ৩৩টি, চট্টগ্রামের ৫টি, নারায়ণগঞ্জের ৩টি, খুলনার ২টি এবং ময়মনসিংহের ১টি কারখানা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে মার্চ ও মে মাসে—এই দুই মাসে ৫৯টি কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করেছে।

অন্যদিকে বিজিএমইএর তথ্যমতে, প্রথম ছয় মাসে তাদের সদস্যভুক্ত ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এসব কারখানার মধ্যে ২৭টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়া ও ছাঁটাইয়ের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং ঢাকা মহানগর এলাকায়।

Advertisements

গাজীপুরে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪৪টি কারখানায় মোট ২ হাজার ১৫৫ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাত্র ৭টি কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ও আর্থিক সংকটের কারণে ৫৫৬ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে রয়েছে এপিএস অ্যাপারেলস, ইভিন্স টেক্সটাইল, ন্যাশনাল পলিমার, সেগ ফ্যাশন এবং বেলিসিমা অ্যাপারেলস। এপিএস অ্যাপারেলস ১৭৯ জন এবং ইভিন্স টেক্সটাইল ১৮০ জন শ্রমিক ছাঁটাই করেছে।

অন্যদিকে বাকি ৩৭টি কারখানায় ১ হাজার ৫৯৯ শ্রমিককে বিভিন্ন কারণে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষের দাবি, আন্দোলন, উৎপাদন ব্যাহত করা, অসদাচরণ, কাগজপত্রে জালিয়াতিসহ বিভিন্ন কারণে এসব শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে অসদাচরণের অভিযোগে।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপনের মতে, সংশোধিত শ্রম আইনের ফলে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ হওয়ায় অনেক শ্রমিক সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। কিন্তু মালিকদের একটি অংশ তা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না। ফলে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে ছাঁটাই করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ রয়েছে। এর আগে মোট শ্রমিকের ২০ শতাংশের সম্মতি প্রয়োজন হতো।

ঈদুল আজহার ছুটির পর সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করে। কারখানার দেয়ালে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শ্রম আইনের ২০ ধারা অনুসরণ করে শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে এবং সকল পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের মতে, শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের কঠোর ঋণনীতি এবং আর্থিক সংকট। তাদের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি চাপে পড়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) রপ্তানি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। অর্থাৎ রপ্তানিতে কিছুটা পতন হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, তা ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংকের সহযোগিতার অভাব এবং কিছু উদ্যোক্তার ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন কারখানাও গড়ে উঠছে, ফলে সামগ্রিক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে না। তাঁর ধারণা, প্রথম ছয় মাসে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ হাজারেরও বেশি, কারণ সব কারখানা সংগঠনকে তথ্য দেয়নি।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও বলেন, অনেক কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় প্রতি মাসেই কিছু কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর কঠোর ঋণনীতির কারণে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের বেআইনিভাবে ছাঁটাই করা হচ্ছে এবং অনেক শ্রমিক আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারের মতে, সরকার বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার সুবিধা নিতে সচল কারখানাও বন্ধ দেখানো হতে পারে। তাই কারখানা বন্ধের প্রকৃত কারণ, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বৈধতা এবং ক্ষতিপূরণ পরিশোধের বিষয়গুলো সরকারিভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে শিল্প পুলিশ, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্য ও বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। তবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। মালিকেরা যেখানে ক্রয়াদেশের ঘাটতি ও আর্থিক সংকটকে দায়ী করছেন, সেখানে শ্রমিক সংগঠনগুলো ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে বাধা, বেআইনি ছাঁটাই এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। ফলে শ্রমবাজারের এই পরিস্থিতি নিরসনে স্বচ্ছ তদন্ত, শ্রম আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং শিল্প খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

সূত্র: প্রথম আলো

Advertisements
আইনকারখানাশ্রমিকশ্রমিক অধিকার