বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ডে-কেয়ার কি বিলাসিতা, নাকি কর্মজীবী বাংলাদেশের অদৃশ্য লাইফলাইন?

WhatsApp Image 2026-07-01 at 7.56.24 PM

একটি ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তেই দেশের হাজারো অভিভাবকের মনে একই প্রশ্ন জাগিয়েছে- ডে-কেয়ারে রেখে কি সত্যিই সন্তান নিরাপদ? ভিডিওটি আতঙ্ক তৈরি করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে সামনে এনেছে আরেকটি বাস্তবতাও। প্রতিদিন সকালে হাজার হাজার কর্মজীবী মা-বাবা এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যার বিকল্প তাদের হাতে প্রায় নেই।

বাংলাদেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে, শহুরে জীবনে আত্মীয়স্বজনের সহায়তা কমছে, আর নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে শিশুর নিরাপদ পরিচর্যার বিষয়টি আর কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশে অসংখ্য নারী মাতৃত্বের পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন শুধুমাত্র সন্তানের দেখভালের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায়। অনেকেই পদোন্নতির সুযোগ ছেড়ে দেন, কেউ খণ্ডকালীন কাজ বেছে নেন, আবার কেউ কর্মজীবনই থামিয়ে দেন। অর্থাৎ একটি মানসম্মত ডে-কেয়ারের অভাব শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, দেশের উৎপাদনশীল জনশক্তিরও ক্ষতি।

তবে ডে-কেয়ার মানেই কেবল শিশুকে কয়েক ঘণ্টা রেখে আসার জায়গা নয়। একটি ভালো ডে-কেয়ার শিশুর ভাষা, সামাজিকতা, আত্মবিশ্বাস, দলগত আচরণ এবং মানসিক বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলা এবং কাঠামোবদ্ধ কার্যক্রম অনেক শিশুর বিকাশে সহায়ক হয়।

Advertisements

অন্যদিকে, নিম্নমানের বা অপর্যাপ্ত তদারকির ডে-কেয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। প্রশিক্ষণহীন পরিচর্যাকারী, শিশুপ্রতি কম জনবল, নিরাপত্তার ঘাটতি কিংবা জবাবদিহির অভাব- এসবই একটি ছোট অবহেলাকে বড় দুর্ঘটনায় পরিণত করতে পারে। সাম্প্রতিক ভাইরাল ঘটনাটি সেই সতর্কবার্তাই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তাহলে সমাধান কী? ডে-কেয়ার এড়িয়ে যাওয়া, নাকি ডে-কেয়ার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা?

বিশেষজ্ঞরা দ্বিতীয় পথেই গুরুত্ব দেন। প্রতিটি ডে-কেয়ারের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার, নির্দিষ্ট শিশু-পরিচর্যাকারী অনুপাত, নিয়মিত সরকারি তদারকি, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের জন্য স্বচ্ছ যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য মানসম্মত ডে-কেয়ার চালু করাও সময়ের দাবি।

একটি নিরাপদ ডে-কেয়ার কেবল একজন মায়ের নিশ্চিন্তে অফিস করার সুযোগ তৈরি করে না; এটি একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করে, একটি পরিবারের মানসিক চাপ কমায় এবং দেশের অর্থনীতিতে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে।

তাই একটি ভাইরাল ভিডিও আমাদের ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু সেই ভয় যেন প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা না তৈরি করে। বরং প্রশ্ন হোক-বাংলাদেশে এমন একটি ডে-কেয়ার ব্যবস্থা কবে গড়ে উঠবে, যেখানে সন্তানের হাত ছেড়ে অফিসে যাওয়ার সময় কোনো মা-বাবার বুক কেঁপে উঠবে না?

Advertisements
ডে-কেয়ারবাংলাদেশবিলাসিতালাইফলাইন