বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
নারী

পাকিস্তানের নারীদের হাতে তৈরি হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল

পাকিস্তানের নারীদের হাতে তৈরি হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি গোল, পেনাল্টি আর শেষ মুহূর্তের জয়সূচক শট—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ফুটবল। বিশ্বের অন্যতম জমকালো এই টুর্নামেন্টে ব্যবহৃত ‘ট্রিওন্ডা’ (Trionda) বলটি তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের শিয়ালকোট শহরে।

পাকিস্তানের শিয়ালকোট শহরের উপশহর সামব্রিয়ালে একটানা গরমের ভেতর ছোট ছোট ঘর ও সেলাই কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে বিশ্বমানের ফুটবল। বাইরে থেকে দেখলে এটি শুধু একটি উৎপাদনশিল্প; কিন্তু ভেতরের দৃশ্য সম্পূর্ণ আলাদা—এটি নারীদের ধৈর্য, শ্রম আর নীরব সংগ্রামের এক দীর্ঘ গল্প।

একটি সাধারণ সেলাই কেন্দ্রের ভেতর বসে আছেন আনসার মজিদ। তার সামনে কাঠের ক্ল্যাম্পে আটকানো একটি ফুটবল, হাতে সূচ আর মোমযুক্ত সুতো। এই কাজ তার কাছে নতুন নয়—প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি ফুটবল সেলাই করছেন। কাজ করতে করতে তার আঙুলের ডগা শক্ত হয়ে গেছে, গাঁটে গাঁটে জমেছে বছরের পর বছরের পরিশ্রমের চিহ্ন।

সূচ চালাতে চালাতে তিনি বলেন,’আমাদের এই হাতই বলে দেয় আমরা এই কাজ করি’।

Advertisements

তার চারপাশে বসে আছেন ১৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী আরও প্রায় ২৫ জন নারী। কেউ নতুন শিখছেন, কেউ দশকের পর দশক ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। ঘরের দেয়ালে রঙিন চিত্রকর্ম, বাতাসে গরমের ভার, আর সবার আঙুলে একই ছন্দ—সুতো টানার অবিরাম শব্দ।

ঘরের ভেতরেই জীবিকার লড়াই

শিয়ালকোটে নারীদের এই কাজ শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং জীবনধারণের একটি নির্ভরতা। অনেকেই বিয়ের পর এই শিল্পে যুক্ত হয়েছেন। কেউ কেউ স্বামীর কাছ থেকে শিখেছেন, কেউ আবার নিজের চেষ্টায় দক্ষ হয়েছেন।

আবিদা হুসেন এমনই একজন। তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি নিজের ঘরকেই কর্মস্থলে পরিণত করেছেন। দিনের শুরু ফজরের নামাজের পর, তারপর পরিবারের নাশতা তৈরি করে তিনি বসে যান সেলাইয়ের কাজে। তার মেয়েরাও এই কাজে যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘এই কাজ আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। আমরা ঘরে থেকেও উপার্জন করতে পারি, সন্তানদের দেখাশোনাও করতে পারি।’

দক্ষতার আড়ালে লুকানো শ্রম

দূর থেকে মনে হতে পারে এটি সহজ কাজ, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ফুটবল তৈরি করতে লাগে অসাধারণ নিখুঁততা। ৩২টি আলাদা প্যানেল একে একে সেলাই করে তৈরি হয় একটি বল। প্রতিটি সেলাই করতে লাগে সমান টান, নির্ভুল গিঁট, আর দীর্ঘ সময়ের ধৈর্য।

একজন দক্ষ নারী দিনে গড়ে মাত্র ৫টি ম্যাচ-মানের বল তৈরি করতে পারেন। অথচ মেশিনে একই সময়ে তৈরি হয় কয়েকগুণ বেশি। তবুও হাতে সেলাই করা বলের মান ও নিখুঁততার কারণে এই কাজ এখনও টিকে আছে—বিশেষ করে প্রিমিয়াম ও প্রশিক্ষণ বলের ক্ষেত্রে।

প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতের কাজ

এই শিল্প শুধু কাজ নয়, এটি অনেক পরিবারের ঐতিহ্যও। অনেক নারী তাদের মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন, আবার তারা শেখাচ্ছেন নিজেদের কন্যাদের। শিয়ালকোটের বহু পরিবারে এটি এখন ঘরোয়া দক্ষতার অংশ।

মুহাম্মদ হুসেন যেমন ১৯৮৮ সাল থেকে এই কাজ করছেন। তিনি শুধু নিজে নয়, তার স্ত্রী ও কন্যাদেরও এই দক্ষতা শিখিয়েছেন। তার বিশ্বাস, এই কাজ পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে।

পরিবর্তনের ছায়া

তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন পরিবর্তনের মুখে। আধুনিক কারখানায় মেশিনে সেলাই হওয়া ফুটবল অনেক বেশি দ্রুত উৎপাদিত হয়। ফলে হাতে সেলাইয়ের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে আসছে।

একটি উৎপাদন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আগে যেখানে ৮০–৯০ শতাংশ ফুটবল হাতে সেলাই হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশে।
তারপরও এই নারীরা থেমে নেই। কারণ এই কাজ তাদের কাছে শুধু অর্থ নয়, বরং আত্মনির্ভরতার প্রতীক।

নীরব শক্তির গল্প

শিয়ালকোটের এই নারীরা আলোচনায় খুব একটা আসেন না। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলোর পেছনে তাদের হাতের স্পর্শ লুকিয়ে থাকে। তাদের প্রতিটি সেলাইয়ে জড়িয়ে আছে পরিবার, সন্তানদের শিক্ষা, আর জীবনের টিকে থাকার সংগ্রাম।

বাইরে যখন গরম বাতাস ধুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়, তখন ঘরের ভেতরে চলতে থাকে সূচের নিরব ছন্দ। কেউ বিরতি নিয়ে চা বানায়, কেউ আবার গল্পের ফাঁকে সেলাই করে চলে।

এই কাজ তাদের জন্য শুধুই পেশা নয়—এটি বেঁচে থাকার এক নীরব যুদ্ধ, যেখানে প্রতিদিনের লড়াই গাঁথা থাকে সুতো আর সূচের মধ্যে।

বিশ্বের বড় বড় টুর্নামেন্টের বল তৈরির এই সাফল্যে নারীদের ভূমিকাও অপরিসীম। কারখানায় কাজ করা দক্ষ নারী কর্মীদের নিখুঁত কারুকার্যের কারণেই আজ বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের বলের এতো কদর।

Advertisements
নারীপাকিস্তানফুটবলবিশ্বকাপ