বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

নানাবাড়ির মায়া, দাদাবাড়ির দায়িত্ব: আদরের ভিন্নতার আড়ালে বাস্তবতা কী?

নানাবাড়ির মায়া, দাদাবাড়ির দায়িত্ব: আদরের ভিন্নতার আড়ালে বাস্তবতা কী?

বাংলা পরিবারে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়—’নানাবাড়ির আদর আলাদা।’ আবার অনেকেই মনে করেন, দাদা-দাদী বা ফুফুরা যেন নাতি-নাতনিদের প্রতি একটু বেশি সংযত, কখনও কখনও কঠোরও। এই ধারণা এতটাই প্রচলিত যে, অনেক শিশু বড় হয় এই বিশ্বাস নিয়েই যে নানাবাড়ি মানেই নিঃশর্ত ভালোবাসা, আর দাদাবাড়ি মানেই নিয়ম-কানুন ও দূরত্ব।

কিন্তু সত্যিই কি ভালোবাসার পরিমাণে পার্থক্য থাকে? নাকি পার্থক্যটা প্রকাশের ধরনে?

পরিবারে কিছু সাধারণ ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যাক। ধরি রুমির পরিবারে আছে মা,বাবা, ভাই,বোন। রুমির মা যখন তার বোনের সন্তানদের কোলে নেন, তখন নানী হিসেবে তার কোনো দ্বিধা থাকে না। বাচ্চা কাঁদলে ঘুম পাড়ান, খাওয়ান, নিয়ে ঘুরে বেড়ান—যেন নিজের সন্তানের মতোই। কিন্তু রুমির ভাইয়ের সন্তানের ক্ষেত্রে একই মানুষকে অনেক সতর্ক দেখা যায়। কিছুক্ষণ আদর করার পরই শিশুটিকে মায়ের হাতে ফিরিয়ে দেন। কোথাও যেন একটি অদৃশ্য সীমারেখা কাজ করে—’যদি কিছু হয়ে যায়, যদি কেউ ভুল বোঝে?’

এই ছোট্ট ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়; অনেক পরিবারেই এমন অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।

Advertisements

এর পেছনে প্রথম কারণ হতে পারে সম্পর্কের সামাজিক অবস্থান। মা যখন মেয়ের সন্তানের যত্ন নেয়, সেখানে সম্পর্কটি অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। তাই শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভয় বা সংকোচ কম থাকে।

অন্যদিকে ছেলের সংসারে সেই নারী একজন দাদি, একজন ফুফু বা পিসি হলে এখানে সন্তানের মা একজন নতুন সদস্য, যার সঙ্গে সম্পর্ক যতই আন্তরিক হোক, অনেক সময় একটি ভদ্র দূরত্ব বজায় থাকে। ফলে শিশুকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি ভাবেন—’মা কী মনে করবেন?’ , কোনো সমস্যা হলে দায় কি আমার ওপর আসবে? এই আত্মসচেতনতা অনেক সময় ভালোবাসাকে আড়াল করে ফেলে।

আরেকটি বড় কারণ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। আমাদের সমাজে সন্তানের লালন-পালনের বিষয়ে মায়ের ভূমিকা এতটাই গুরুত্ব পায় যে অন্য কেউ বেশি হস্তক্ষেপ করলে সেটিকে অনেকে ভালোভাবে নেন না। তাই দাদা-দাদী, ফুফু বা চাচারা অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সংযত রাখেন।

অন্যদিকে নানাবাড়ির পরিবেশে মেয়ের বাবা-মা সাধারণত নিজেদের দায়িত্ববোধের ধারাবাহিকতাই বজায় রাখেন। যে মেয়েকে ছোটবেলা থেকে আগলে রেখেছেন, তার সন্তানদের প্রতিও সেই স্নেহ সহজাতভাবে প্রবাহিত হয়। সেখানে ‘অতিথি’ নয়, বরং ‘নিজের মেয়ের সন্তান’ ভাবনাটি বেশি কাজ করে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—স্নেহ আর দায়িত্ব সবসময় একই ভাষায় প্রকাশ পায় না।

দাদা-দাদী অনেক সময় নাতি-নাতনিকে বেশি শাসন করেন, নিয়ম শেখান, ভুল ধরিয়ে দেন। কারণ শিশুটি বড় হয়ে যে পরিবার, ঐতিহ্য ও দায়িত্ব বহন করবে, সেটির সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সংযোগ থাকে। তাদের ভালোবাসা অনেক সময় কোমল কথার বদলে প্রকাশ পায় শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

অন্যদিকে নানা-নানীর ভালোবাসা অনেক সময় বেশি আবেগপ্রবণ ও প্রশ্রয়মিশ্রিত হয়। কারণ তাদের কাছে নাতি-নাতনিরা শুধু নতুন প্রজন্ম নয়; নিজের মেয়ের শৈশবেরও এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি। তাই দুই ধরনের ভালোবাসাকে এক পাল্লায় মাপা হয়তো ঠিক নয়।

আরেকটি বিষয়ও আমাদের ভাবতে হবে। অনেক সময় পরিবার নিজেরাই অজান্তে এই বিভাজন তৈরি করে। যদি ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে বলা হয়, ‘নানাবাড়িতে সবাই তোমাকে বেশি ভালোবাসে’, কিংবা ‘দাদাবাড়িতে সাবধানে থাকবে’ —তবে শিশুর মনেও একটি স্থায়ী ধারণা জন্ম নেয়। এরপর প্রতিটি আচরণ সে সেই ধারণার আলোতেই বিচার করে।

অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক দাদা-দাদী নীরবে নাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, শিক্ষা বা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ান, আবার অনেক নানা-নানীও প্রয়োজন হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেন। সম্পর্কের গভীরতা সবসময় প্রকাশভঙ্গিতে ধরা পড়ে না।

পরিবারের সৌন্দর্য এখানেই যে, প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব রং আছে। কেউ আদর দিয়ে আগলে রাখেন, কেউ শাসন করে শক্ত হতে শেখান, কেউ দূরত্ব রেখে দায়িত্ব পালন করেন, আবার কেউ নিঃশর্ত আশ্রয় হয়ে থাকেন।

ভালোবাসার ভাষা সবার এক নয়। কেউ কোলে তুলে প্রকাশ করেন, কেউ দূর থেকে খোঁজ রাখেন; কেউ মুখে বলেন, কেউ কাজের মাধ্যমে জানান। তাই নানাবাড়ি আর দাদাবাড়ির তুলনা করার বদলে যদি আমরা প্রতিটি সম্পর্ককে তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে বুঝতে শিখি, তাহলে হয়তো উপলব্ধি করব—ভালোবাসার রূপ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার গভীরতা সবসময় চোখে দেখা যায় না। পরিবারের বন্ধন তখনই সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন আমরা ভালোবাসাকে প্রতিযোগিতা নয়, বৈচিত্র্য হিসেবে দেখতে শিখি।

Advertisements
আদরের ভিন্নতাদাদাবাড়িনানাবাড়ি