গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবনে শিশুর অটিজমের কতটা ঝুঁকি?

গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবনের ফলে শিশুর অটিজম বা এডিএইচডি হওয়ার ঝুঁকি নেই। সমন্বিত এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘জ্যামা ইন্টারনাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি গর্ভবতী মায়েদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দুশ্চিন্তা ও বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়েছে।
সাধারণত জ্বর ও ব্যথা উপশমে প্যারাসিটামল বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত একটি ওষুধ। অন্যান্য পেইনকিলারের তুলনায় গর্ভাবস্থায় এটিকে নিরাপদ মনে করা হলেও, বিগত কয়েক বছরের কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে—গর্ভকালীন সময়ে এই ওষুধ সেবন করলে অনাগত সন্তানের অটিজম বা মনোযোগের ঘাটতিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষ তো বটেই, চিকিৎসকদের মধ্যেও এটি নিয়ে এক ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছিল।
এই সংশয় দূর করতে গবেষকরা হংকংয়ের প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার মা ও শিশুর প্রায় দুই দশকের নিখুঁত স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে চিকিৎসকরা ‘সিবলিং কম্প্যারিসন’ বা একই মায়ের গর্ভজাত ভাই-বোনদের মধ্যে তুলনামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, একই পরিবারের এক সন্তানের জন্মের সময় মা প্যারাসিটামল খেয়েছিলেন, কিন্তু অন্য সন্তানের সময় খাননি—এমন ভাই-বোনদের তথ্য তুলনা করা হয়।
এই বিশেষ পদ্ধতির কারণে জিনগত বা পারিবারিক পরিবেশগত অন্যান্য প্রভাবগুলোকে আলাদা করা সম্ভব হয়েছে, যা আগের গবেষণাগুলোতে করা যায়নি।
দীর্ঘ এই পর্যালোচনার পর গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবনের কারণে শিশুদের অটিজম বা এডিএইচডি হওয়ার বাড়তি কোনো ঝুঁকি নেই। গর্ভাবস্থার কোন সময়ে, কী পরিমাণে বা কতবার এই ওষুধ নেওয়া হয়েছে—তার ওপরেও এই ফলাফলের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আগের গবেষণাগুলো কেন ভিন্ন ছিল?
গবেষকরা জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোতে কিছু ফাঁকফোকর বা বিভ্রান্তিকর উপাদান ছিল। যেসব মায়েরা গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল নিয়েছিলেন, তারা মূলত তীব্র জ্বর, গুরুতর ইনফেকশন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার মতো সমস্যায় ভুগছিলেন।
মূলত মায়ের শরীরের সেইসব জটিলতা কিংবা পারিবারিক জিনগত বৈশিষ্ট্যই শিশুর স্নায়বিক বিকাশে প্রভাব ফেলেছিল, প্যারাসিটামল ওষুধটি নয়।
নতুন গবেষণাতেও যখন সাধারণ নিয়মে ডাটা দেখা হয়েছিল, তখন হালকা ঝুঁকি মনে হয়েছিল। কিন্তু যখনই ভাই-বোনদের ডাটা মেলানো হলো এবং অন্যান্য পারিবারিক প্রভাবগুলো বাদ দেওয়া হলো, তখনই দেখা গেল প্যারাসিটামলের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্কই নেই।
গর্ভবতী মায়েদের জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ:
এই গবেষণার মূল লেখকরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘আমাদের এই গবেষণায় গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহারের নিরাপত্তার বিষয়টি জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রথাগত গবেষণায় যে ঝুঁকির আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তা মূলত পারিবারিক ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক জটিলতার কারণে হয়েছিল।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় তীব্র জ্বর বা ইনফেকশন চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অহেতুক ভয়ের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো—গর্ভবতী মায়েরা যেকোনো শারীরিক প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে, সবচেয়ে কম মাত্রায় এবং যতটুকু কম সময় সম্ভব, নিরাপদেই প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে পারবেন।



