Skip to content

১৯শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দুঃশলা: দুর্ভাগ্যের শিকার এক নারীর গাথা

ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর একমাত্র কন্যা দুঃশলা। দুর্যোধনের কনিষ্ঠা বোন। সিন্ধুরাজ বৃদ্ধক্ষেত্রের পুত্র জয়দ্রথের সঙ্গে দুঃশলার বিয়ে হয়। দুঃশলা ছাড়াও জয়দ্রথের আরও পত্নী ছিল। জয়দ্রথের ঔরসে ও দুঃশলার গর্ভে এক পুত্রের জন্ম। নাম সুরথ। দুঃশলা কৌরববংশের রাজকন্যা কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে বা দুর্যোধনদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়নি কোথাও। কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে দুঃশলা জয়দ্রথের পাণিপ্রার্থী হতে না চাইলেও তাকে জোর করেই অনেকটা জয়দ্রথের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়।

দুঃশলার শেষ পরিণতি ভয়াবহ। কারণ জয়দ্রথের চরিত্র-আচার-আচরণ কোনোটাই সুবিধাজনক ছিল না। বনপর্বে পাণ্ডবরা যখন কাম্যক বনে অবস্থান করছিল, তখন বিয়ের উদ্দেশ্যে সেই বনের মধ্যে দিয়ে জয়দ্রথ শাল্বরাজ্যে গমনরত অবস্থায় দ্রৌপদীকে দেখে। জয়দ্রথের কামনা জাগে। পাণ্ডবরাও আশ্রমে অনুপস্থিত ছিল। সে সুযোগেই জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে হরণ করার চেষ্টা করে। জয়দ্রথের এরূপ অশুভ আচরণে দ্রৌপদী ক্ষিপ্ত হলেও জয়দ্রথের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায় না। বরং দ্বিগুণ বেগে দ্রৌপদীকে টেনেহিঁচড়ে রথে তুলতে চেষ্টা করে। এই সময় পাণ্ডরা সব ঘটনা জেনে আশ্রমে ফিরে আসে। জয়দ্রথের পশ্চাদ্ধাবন করে। জয়দ্রথের সৈন্যরা পরাস্ত ও নিহত হওয়ার পর দ্রৌপদীকে রথ থেকে নামিয়ে দিয়ে স্থান পরিত্যাগের চেষ্টা করে জয়দ্রথ। ভীম ও অর্জুন তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলে। যেহেতু দুঃশলা পাণ্ডবদের বোন, সেহেতু যুধিষ্ঠির তাকে ক্ষমা করে দেয়। দাসত্ব থেকেও মুক্তি দেয়।

জয়দ্রথের এমন হীনকর্মেও নিষ্ক্রিয় দুঃশলা। তবে মহাভারতের নারী চরিত্রগুলো দেখলে মনে হয়, প্রত্যেকটি চরিত্র একেকটি পুতুল। চরিত্রগুলোকে যতটুকু উপস্থিত করা উচিত, তার বাইরে একচুলও বিস্তৃত করেননি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। তবে এই যতটুকুর মধ্যেও যথেষ্ট ঘাটতি। কারণ এর আগেও মহাভারতের কিছু বিশেষ চরিত্র দেখানো হয়েছে, সেখানে রাজদরবারে তাদের কিছু কিছু বিচরণ দেখা যায়। কিন্তু দুঃশলা কৌরবব বংশের একমাত্র রাজকন্যা হওয়া সত্ত্বেও তাকে নীরব থাকতে দেখা যায়।

আবার জয়দ্রথের এমন অশোভন আচরণে দুঃশলা কতটা মনক্ষুণ্ন বা আসলেই পক্ষে না বিপক্ষে, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। দুঃশলা যেহেতু হস্তিনাপুরের একমাত্র রাজকন্যা, সেহেতু তার বেড়ে ওঠা এবং রাজদরবারে,পিতা ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারীর কাছে আলাদা সম্মান-মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া কথা। কিন্তু মহাভারতের এরূপ চরিত্রগুলোই প্রমাণ করে আবহমান কাল ধরে পুত্রের কদর যেরূপ, কন্যার প্রতি যত্ন-আত্তি তার তিল পরিমাণও নয়। ধৃতরাষ্ট্র শতপুত্রের আশায় গান্ধারীকে বিয়ে করে। সেখানে এক কন্যা! সেটা নাহলেও যেন চলে। আর যেহেতু জন্মই নিয়েছে, সেহেতু প্রাসাদের এক কোণে দাসীর মতোই বড় হয়েছে। নাহলে দুঃশলার জীবন-তার আচার-আচরণ সবই স্থান পেতো মহাভারতের পাতায়।

আবার নারীরা যে সর্বদা পুরুষের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে নিজেদের সমর্পণ করে, তার উদাহরণ হতে পারে দুঃশলা থেকে শুরু করে মহাভারতে সব নারীই। সেখানে অম্বা, অম্বালিকা, মাদ্রী, বিদুরের মাতা শূদ্রা কেউই বাদ পড়ে না। লম্পট, ব্যাভিচারী জয়দ্রথের সঙ্গেই দুঃশলার বিয়ে হয়। কারণ রাজ্য শক্তি। এক্ষেত্রে তৎকালীন সময়ে রাজকন্যারা যে শুধু বলির পাঠা ছিল, তেমনটাই ধারণা পাওয়া যায়। কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস সমাজের ঠুনকো-ঝাপসা এসব চিত্রও পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

যুধিষ্ঠিরের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে দুঃশলার স্বামী জয়দ্রথ মহাদেবের তপস্যায় রত হয়। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেবের কাছে বর চায়। অর্জুন ভিন্ন সমস্ত পাণ্ডবকে অন্তত একদিনের জন্যও জয় করতে পারার বর লাভ করে। ফলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোণাচার্য যে চক্রব্যূহ নির্মাণ করে, তার ব্যূহদ্বার রক্ষকরূপে চার পাণ্ডবকে সে পরাজিত করে। ওই ঘটনায় অভিমন্যু নিহত হয়। অর্জুন শিবিরে প্রস্থান করে জয়দ্রথকে মুণ্ডচ্ছেদ করে। জয়দ্রথের নিহত হওয়ায় দুঃশলার মনের অবস্থা কী হয়েছিল, সে-সম্পর্কে তেমন কোনো ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়নি। পিতা ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারীর পক্ষ থেকেও মেয়ের দুর্দশাকে কেন্দ্র কোনোরূপ বিকার দেখা যায়নি। বরং শতপুত্রের মৃত্যুতে গান্ধারীকে দেখা গেছে কৃষ্ণকে অভিশাপ দিতে। তবে দুঃশলাকে নিয়ে স্বয়ং লেখকও কোনো সহানুভূতি সৃষ্টি করেননি। দুঃশলার পুত্র সুরথও মহাভারতের যুদ্ধে নিহত হয়। সুরথের নাবালক পুত্র তখন রাজ্যাভিষিক্ত হয়।

মহাভারত জাত মহাকাব্যের একটি। তবে মহাভারতের কলেবর যত বেড়েছে, পুরুষ চরিত্রের পরাক্রমশালী বর্ণনাও তত বেড়েছে। কিন্তু নারীদের হাহাকার, মর্যাদা, সম্মান; কোনোকিছুরই যে শেষ রক্ষা হয়নি, তা মহাভারতের পাতায় পাতায় প্রমাণিত হয়েছে। দ্রৌপদীর অপমান, গান্ধারীকে আজীবন অন্ধত্ব বরণ, মাদ্রীর মৃত্যু, সত্যবতীর দুর্ভাগ্য, কুন্তীর হাহাকার, দুঃশলা, রাধা, সত্যভামা প্রভৃতি সব চরিত্র যেন তলিয়ে গেছে পুরুষের তর্জন-গর্জনে। নারীদের হৃদয়কেও যেন লুটিয়ে দেওয়া হয়েছে যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে! দুঃশলাও ভাগ্যের সেই নির্মম পরিণতির শিকার।

অনন্যা/এআই