যে অভিনেত্রীর জন্য নিজেই বাড়িতে প্রজেক্টর নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়

মাত্র কয়েক মিনিটের উপস্থিতি, তবু অমর: চুনীবালা দেবী- যাকে ছাড়া ‘পথের পাঁচালী’ অসম্পূর্ণ। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের পর্দায় উপস্থিতি খুব অল্প সময়ের হলেও তাঁদের অভিনয় দর্শকের মনে অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে। সেই বিরল শিল্পীদের অন্যতম চুনীবালা দেবী। তিনি শুধু একজন অভিনেত্রী নন, বরং ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতা একবার বলেছিলেন, “উত্তমকুমার না থাকলে যেমন ‘নায়ক’ করতাম না, ঠিক তেমনি চুনীবালা দেবী না থাকলে ‘পথের পাঁচালী’ও হতো না।” এই একটি মন্তব্যই প্রমাণ করে, ‘ইন্দির ঠাকরুণ’ চরিত্রটি তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর পুনর্জন্ম
‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। অপু, দুর্গা, সর্বজয়া, হরিহর- প্রায় সব চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রী ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু ইন্দির ঠাকরুণের জন্য উপযুক্ত মুখ খুঁজে পাচ্ছিলেন না সত্যজিৎ রায়।
শেষ পর্যন্ত খবর আসে, কলকাতার পাইকপাড়ার একটি বস্তিতে বাস করেন প্রায় আশি বছর বয়সী এক বৃদ্ধা- চুনীবালা দেবী। বহু বছর আগে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তখন তিনি কার্যত বিস্মৃত।
সত্যজিৎ রায় নিজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। বৃদ্ধার মুখের প্রতিটি ভাঁজ, ঝুলে পড়া গাল আর অভিব্যক্তি দেখে তিনি বুঝে যান- এই মানুষটিই তাঁর কল্পনার ইন্দির ঠাকরুণ।
স্মৃতিশক্তি আর আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ পরিচালক
সাক্ষাতের সময় সত্যজিৎ রায় তাঁকে একটি ছড়া বলতে বলেন। আশি বছরের বৃদ্ধা একটানা পুরো ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি’ ছড়াটি আবৃত্তি করে শোনান। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি দেখে সত্যজিৎ রায় বিস্মিত হন। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ইন্দির ঠাকরুণের চরিত্রে আর কাউকে ভাবার প্রয়োজন নেই।
অভিনয়ের চেয়ে বড় ছিল নিষ্ঠা
শুটিংয়ের জন্য প্রতিদিন কলকাতা থেকে দূরের লোকেশনে যেতে হতো। বয়সের কথা ভেবে সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু চুনীবালা দেবী দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, “তোমরা এত কষ্ট করে কাজ করছ, এটুকু কষ্ট আমি ঠিক করতে পারব।” পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন দিনে মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু সত্যজিৎ রায় তাঁকে প্রতিদিন ২০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিদিন ট্যাক্সিতে করে তাঁকে শুটিংয়ে আনা-নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়।
যে গান আজও অমর
শুটিং চলাকালে সত্যজিৎ রায় জানতে চান, তিনি ধর্মীয় গান গাইতে পারেন কি না। চুনীবালা দেবী খালি গলায় গেয়ে ওঠেন-
“হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে…”
তাঁর কণ্ঠের আবেগে এতটাই মুগ্ধ হন পরিচালক যে আলাদা কোনো শিল্পী দিয়ে গান রেকর্ড করানোর পরিকল্পনা বাতিল করেন। ছবিতে ব্যবহৃত হয় চুনীবালা দেবীর নিজের কণ্ঠ। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটি আজও অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।
মুক্তির আগেই বিদায়
১৯৫২ সালে শুরু হওয়া ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ শেষ হতে প্রায় তিন বছর লেগেছিল। সত্যজিৎ রায় বুঝতে পেরেছিলেন, ছবির মুক্তি পর্যন্ত হয়তো চুনীবালা দেবী বেঁচে থাকবেন না। তাই তিনি একদিন প্রজেক্টর নিয়ে নিজেই তাঁর বাড়িতে যান এবং সম্পূর্ণ ছবিটি তাঁকে দেখান। একজন পরিচালকের এই মানবিক উদ্যোগ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৫৫ সালে ছবি মুক্তির আগেই চুনীবালা দেবী মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর পরও বিশ্বজয়
‘পথের পাঁচালী’ মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য সম্মান অর্জন করে। চুনীবালা দেবীও তাঁর অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান এবং ভারতীয় অভিনেত্রীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অভিনয় সম্মানপ্রাপ্ত প্রথম দিকের শিল্পীদের একজন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। কিন্তু সেই সম্মান গ্রহণ করার জন্য তিনি আর জীবিত ছিলেন না।
বাংলা চলচ্চিত্রের এক অমর মুখ
চুনীবালা দেবীর চলচ্চিত্রজীবন হয়তো দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু তাঁর অভিনীত ইন্দির ঠাকরুণ চরিত্রটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে। কয়েক মিনিটের উপস্থিতিতে কীভাবে একটি চরিত্র পুরো চলচ্চিত্রের আবেগের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ তিনি।
আজও ‘পথের পাঁচালী’ দেখলে দর্শকের মনে প্রথম যে মুখগুলোর কথা আসে, তার মধ্যে অন্যতম ইন্দির ঠাকরুণ। আর সেই মুখের আড়ালে ছিলেন এক বিস্মৃত অথচ অসামান্য শিল্পী- চুনীবালা দেবী। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিল্প কখনও সময়ের কাছে হার মানে না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।



