বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
নারী

যে নারী প্রমাণ করেছিলেন, বিপ্লবের নেতৃত্ব শুধু পুরুষদের হাতে ছিল না

WhatsApp Image 2026-07-02 at 9.05.10 PM

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অসংখ্য পুরুষ বিপ্লবীর নাম উচ্চারিত হলেও অনেক সাহসী নারীর অবদান আজও আড়ালে রয়ে গেছে। তেমনই এক বিস্মৃত নাম কল্যাণী দাস- যিনি শুধু একজন বিপ্লবী নন, ছিলেন সংগঠক, ছাত্রনেত্রী, সমাজসেবী এবং নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। জন্ম কৃষ্ণনগরে হলেও তার পিতৃভূমি ছিল চট্টগ্রাম। আর সেই সূত্রেই চট্টগ্রামের বিপ্লবী ঐতিহ্যের সঙ্গে তার নাম ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে।

১৯০৭ সালের ২৮ মে কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন কল্যাণী দাস। তার বাবা বেণী মাধব দাস ছিলেন দেশপ্রেমিক শিক্ষাবিদ এবং মা সরলা দাস ছিলেন দক্ষ সংগঠক। ছোট বোন বীণা দাসও ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের অন্যতম সাহসী মুখ। পরিবার থেকেই দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং নেতৃত্বের শিক্ষা পেয়েছিলেন কল্যাণী।

শিক্ষাজীবনেই তিনি বুঝতে পারেন, স্বাধীনতা শুধু পুরুষদের সংগ্রামের বিষয় নয়-নারীদেরও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কটকের র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা শেষে কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯২৮ সালে বি.এ. পাস করার পর এম.এ.-তে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত ‘ছাত্রী সংঘ’-এর সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে অসংখ্য তরুণী প্রথমবারের মতো জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার সাহস পান।

১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে ছাত্রীরা যাতে সামনের সারিতে থেকে অংশ নিতে পারে, সে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কল্যাণী দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ১৯৩২ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাবরণ করতে হয়। কিন্তু কারাগারও তার মনোবল ভাঙতে পারেনি।

Advertisements

১৯৩৮ সালে নির্মলেন্দু ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও সংসার তার সংগ্রামের পথ রোধ করতে পারেনি। স্বামীর কর্মসূত্রে বোম্বেতে চলে যাওয়ার পরও তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে আবারও গ্রেপ্তার হন এবং তিন মাস কারাভোগ করেন।

রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি নারী সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও তিনি ছিলেন সমান নিবেদিত। বিয়ের পরই নারী রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য ‘মন্দিরা’ নামে একটি মুখপত্র প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে নিজের সংগ্রামী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আত্মজীবনী ‘জীবন অধ্যয়ন’-এ। এই বই শুধু একজন নারীর জীবনের গল্প নয়; এটি স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার এক মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল।

১৯৮৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তার সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু তার আদর্শ, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগ আজও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।কল্যাণী দাসের জন্ম চট্টগ্রামে না হলেও তার শিকড় ছিল এই জনপদে। তাই চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসে তার নামও সমান গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, স্বাধীনতার লড়াই শুধু বন্দুক হাতে নয়- সংগঠন গড়ে, মানুষকে জাগিয়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে দাঁড়িয়েও ইতিহাস লেখা যায়।

আজ যখন স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখন কল্যাণী দাসের মতো বিস্মৃত বীরাঙ্গনাদের সামনে নিয়ে আসা সময়ের দাবি। কারণ ইতিহাসের অনেক বড় অধ্যায় এখনও তাদের নামেই লেখা, যাদের গল্প আমরা খুব কমই শুনেছি।

Advertisements
নারীনেতৃত্বপুরুষবিপ্লব