বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
নারী

জন্মদিনে আত্মজীবনীর উপহার পেলেন ফেরদৌসী রহমান

ezgif-3067042a596b1a75

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’ প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। ২৮ জুন, তার ৮৫তম জন্মদিনে বইটি শিল্পীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

শৈশবে ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন ঘটা করে পালনের কোনো রীতি ছিল না। তার বড় ভাই, সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের জন্মদিনে পরিবারে আনন্দ-উৎসব, গান, কবিতা ও খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হলেও তার নিজের জন্মদিন ছিল অনেকটাই সাধারণ। তবে একটি বিশেষ ঘটনা সেই ধারাকে বদলে দেয়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি সারা দেশের মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম স্থান অর্জন করলে তার বাবা প্রথমবারের মতো মেয়ের জন্মদিন বিশেষভাবে উদ্‌যাপন করেন।

সেই উদ্‌যাপনে বর্তমান সময়ের মতো কেক, বেলুন কিংবা জাঁকজমক ছিল না। বরং পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করেছেন গান, গল্প আর আড্ডার মাধ্যমে। ফেরদৌসী রহমানের বহু বন্ধু গান পরিবেশন করেছিলেন, আর সেই আয়োজন গভীর রাত পর্যন্ত চলেছিল।

বাবা জীবিত থাকাকালীন ওই একবারই তার জন্মদিন বিশেষভাবে পালন করা হয়েছিল। পরে বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘এবার তোমার জন্মদিন উদ্‌যাপন হলো, এরপর এমন কাজ করো যাতে দেশের মানুষ নিজেরাই তোমার জন্মদিন পালন করে।’

Advertisements

বিয়ের পর প্রতি জন্মদিনে তার স্বামী রেজাউর রহমান তাকে উপহার দিতেন। এখনও তার জন্মদিন খুব ঘরোয়া পরিবেশেই পালিত হয়, যদিও প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতি এখন সেই দিনটিকে অন্যরকম অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়।

ফেরদৌসী রহমানের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তার বাবা, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। বাবাকেই তিনি তার প্রকৃত গুরু, ওস্তাদ, স্বপ্নদ্রষ্টা এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচনা করেন। আব্বাসউদ্দীন চাইতেন তার মেয়ে যেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে, স্বাবলম্বী হয় এবং বাংলা সংগীতকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে।

শুধু বাবা নয়, তিনি ছিলেন ফেরদৌসী রহমানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। জীবনের প্রতিটি সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন কিংবা দ্বিধা তিনি অকপটে বাবার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। আত্মজীবনীর প্রতিটি অধ্যায়ে বাবার স্মৃতি ও শিক্ষা নানা রূপে ফিরে এসেছে। বাবা আজ আর নেই, কিন্তু তার দেওয়া আদর্শ ও অনুপ্রেরণাই এখনো ফেরদৌসী রহমানের সাহস, শক্তি ও পথচলার ভিত্তি।

তার মা লুৎফুন্নেসাও ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সমাজসেবা, নারী উন্নয়ন এবং নারীদের শিক্ষার প্রসারে তিনি কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করেছেন। মায়ের কাছ থেকেই ফেরদৌসী রহমান নারীর স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি লাভ করেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে ফেরদৌসী রহমান এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। সংগীতশিল্পী হিসেবে অসংখ্য জনপ্রিয় গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে ‘এসো গান শিখি’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের কয়েক প্রজন্মকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছেন। অসংখ্য শিল্পীর সংগীতজীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাই আজও বহু মানুষের কাছে তিনি স্নেহভরে পরিচিত ‘এসো গান শিখি’র খালামণি হিসেবে।

রেজাউর রহমান ২০২৪ সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ফেরদৌসী রহমান বলেন, মাত্র এক দিনের নোটিশে যেন তিনি তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। আজ তার দুই ছেলে নিজ নিজ পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকেন। মা-বাবা, ভাই-ভাবি এবং স্বামী—সবাই একে একে বিদায় নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে সহকারী নাজমাকে নিয়ে বসবাস করছেন।

৮০ বছর পেরিয়ে আসার পর জীবনের প্রতিটি দিনকে তিনি ‘বোনাস’ হিসেবে দেখেন। তার ভাষায়, তিনি অত্যন্ত রঙিন ও পরিপূর্ণ একটি জীবন কাটিয়েছেন। তাই বর্তমানের একাকীত্ব নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, এটি সৃষ্টিকর্তার একটি পরীক্ষা। তার সহকর্মীরা তাকে আশ্বস্ত করেন যে জীবনের আগের সব পরীক্ষার মতো এই পরীক্ষাতেও তিনি সফল হবেন।

আত্মজীবনী লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’-তে ফেরদৌসী রহমান লিখেছেন, সংগীতই তার জীবন। মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সুর ও সংগীতের উপস্থিতি রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। গান গাওয়া, গান শোনা এবং সংগীতকে ভালোবাসতেই তার জীবনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম হয়েছে। আজও প্রথম দিনের মতো একই আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি সংগীতকে ধারণ করে আছেন।

তার মতে, ‘প্রেম’ কেবল নারী-পুরুষের সম্পর্ক নয়। তার কাছে প্রেম মানে সংগীত, গান এবং শিল্পের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। সংগীত তার সমগ্র জীবন, তার অস্তিত্ব এবং আত্মাকে ঘিরে রেখেছে। একজন শিল্পীর জন্য প্রকৃত তৃপ্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপূর্ণতাও তাকে সামনে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। সেই সাধনা, সেই নিরন্তর অনুশীলন এবং শিল্পচর্চার কঠিন পথকেই তিনি নিজের ‘জ্বালা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই দীর্ঘ শিল্পজীবনের সাফল্য, সংগ্রাম, আনন্দ, বেদনা এবং উপলব্ধির প্রতিটি অধ্যায় তিনি তুলে ধরেছেন তার আত্মজীবনীতে।

এই বইকে ঘিরে আগামী ৭ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে প্রথমা প্রকাশন।

Advertisements
আত্মজীবনীউপহারজন্মদিনফেরদৌসীরহমান