ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল ১৮ দিনের সন্তান

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধসে পড়া নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৮ দিন বয়সী সন্তানসহ এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়ার পর ডায়ানা প্যাটিনো নামের ওই মা জানিয়েছেন, ভয়াবহ সেই সময়টিতে তার নবজাতক ছেলে হুয়ান ডেভিডই তাকে বেঁচে থাকার শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে—এই বিশ্বাসই তাকে প্রতিটি মুহূর্তে জেগে থাকতে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

ডায়ানা প্যাটিনো বলেন, ‘যতক্ষণ সে বেঁচে ছিল, ততক্ষণ আমিও বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। প্রতিটি মুহূর্তে আমি তার নাকে হাত দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম, সে শ্বাস নিচ্ছে কি না।’
১৮ দিন বয়সী সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তার উদ্ধারের ভিডিও ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েও বেঁচে থাকা নবজাতক হুয়ান ডেভিড অনেকের কাছে আশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাজধানী কারাকাস, বন্দরনগরী লা গুয়েরাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়ে। এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) আশঙ্কা করছে, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এ ঘটনাকে দেশটির ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভূমিকম্পের পর দেশটিতে এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও জীবিত মানুষকে উদ্ধারের আশা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে।
ভূমিকম্পের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ভূগর্ভস্থ তলায় ছোট্ট শিশুসন্তানকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে থাকার সেই ভয়াবহ সময়ের বিবরণ রোববার কারাকাসের একটি ক্লিনিকে বিবিসিকে জানান ডায়ানা প্যাটিনো।
ভূমিকম্পের সময় ডায়ানা লা গুয়েরার উত্তর উপকূলীয় এলাকায় তার অষ্টম তলার অ্যাপার্টমেন্টে বাসনপত্র ধুচ্ছিলেন। হালকা কম্পন হবে ভেবে তিনি দ্রুত গিয়ে তার ছেলেকে কোলে নেন।
ডায়ানা বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি উড়ছি। এরপর মনে হলো আমি পানি ও ময়লা-আবর্জনার নিচে তলিয়ে যাচ্ছি। তারপর আমি একটি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলাম এবং সেখানেই আটকে থাকলাম। আমি জানি না কীভাবে আমি আমার সন্তানকে ধরে রাখতে পেরেছিলাম। কারণ, আমি তখন উড়ছিলাম। আমি আসবাবের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিলাম।’ ডায়ানা জানান, তিনি চিৎকার করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু শিগগিরই বুঝতে পারলেন যে কেউ তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে না।
ঘটনার বিবরণে ডায়ানা প্যাটিনো বলেন, ‘আমি নিজেকে বললাম, আমি চিৎকার করে আমার শক্তি নষ্ট করব না—যখন প্রয়োজন হবে, অর্থাৎ যখন আমি আশপাশে কারও কণ্ঠস্বর বা পায়ের আওয়াজ শুনতে পাব, ঠিক তখনই আমি চিৎকার করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানি না, কীভাবে আমি এতটা শান্ত ছিলাম। কারণ, আমার বাঁ পা কংক্রিটের নিচে আটকে গিয়েছিল। আমি নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। আমার মাথার একপাশ একটি পাথরের সঙ্গে চেপে ছিল।’
ডায়ানা জানান, যখন তিনি তার শরীরের নিচে একটি বাইবেল আছে বুঝতে পারলেন, তখন তিনি আশাবাদী হয়ে ওঠেন।
‘সেখান থেকেই আমার বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়েছিল,’ বলেন ডায়ানা।
ডায়ানা প্যাটিনো বলেন, ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারের মধ্যে তিনি সুইয়ের ছিদ্রের মতো ক্ষুদ্র একচিলতে আলো দেখতে পাচ্ছিলেন, যা দেখতে অনেকটা চাঁদের মতো ছিল। তিনি জানান, তার ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম ধরে ডাক শোনার পরই তার উদ্ধার পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়।
ডায়ানা প্যাটিনো আরও বলেন, ‘আমি নিজেকে বললাম, এটাই আমার একমাত্র সুযোগ। আমি আমার গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম…সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, ‘আমি এখানে’, আর সে বলল, ‘আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি এবং আমি কথা দিচ্ছি যে তোমাকে বের না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না।’
ডায়ানার ভাই সেই কথা রেখেছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে একটি অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে মা ও শিশু উভয়কে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা হয়।
ভূমিকম্পে ডায়ানার দুই পা-ই জখম হয়েছে, তবে সৌভাগ্যবশত হুয়ানের কেবল সামান্য চোট লেগেছে।
ডায়ানার স্বামী গেরসন মাত্রই বাড়ি ফিরে গাড়িটি পার্ক করেছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ভূমিকম্প আঘাত হানে। তিনি একটি বেড়া টপকে নিরাপদ স্থানে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটির যা দশা হয়েছিল, তা দেখে তিনি চরম কোনো অঘটনের আশঙ্কা করেছিলেন। তার সন্তান ও স্ত্রী উদ্ধার হওয়ার সেই মুহূর্ত তার কাছে ছিল একটি ‘অলৌকিক ঘটনা’।



