বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

বিয়ে যদি হয় আজীবনের বন্ধন তবে কেন ভেঙে যাচ্ছে সংসার?

download

একসময় বলা হতো, বিয়ে মানেই আজীবনের বন্ধন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ভালোবেসে বিয়ে করেও অনেক দম্পতির সম্পর্ক টিকছে না, আবার পারিবারিকভাবে হওয়া বিয়েও কয়েক বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদে গড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যস্ত জীবন, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, অবাস্তব প্রত্যাশা- সব মিলিয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে।

তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি সংসার ভেঙে যাওয়ার পেছনে সাধারণত একটি নয়, বরং অনেক ছোট ছোট কারণ একসঙ্গে কাজ করে। আবার একইভাবে, সংসার টিকিয়েও রাখে অনেক ছোট ছোট অভ্যাস, যা আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দিই না।
সংসার কি শুধু একজনের চেষ্টায় টিকে? এর উত্তর এক কথায়- না।

একটি দাম্পত্য সম্পর্ক দুইজন মানুষের যৌথ দায়িত্ব। একজন যতই চেষ্টা করুন, অন্যজন যদি সম্পর্কের প্রতি উদাসীন থাকেন, তাহলে সেই সম্পর্ক দীর্ঘদিন সুস্থভাবে টিকে থাকা কঠিন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই উচিত একে অপরকে সম্মান করা, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা, দায়িত্ব ভাগাভাগি করা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরকে দোষারোপ না করে সমাধানের পথ খোঁজা।

পারস্পরিক বোঝাপড়া আসলে কী?

অনেকেই মনে করেন, সব বিষয়ে একমত হওয়াই বোঝাপড়া। বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। পারস্পরিক বোঝাপড়া মানে হলো- সঙ্গীর কথা মন দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, মতের অমিল হলেও সম্মান বজায় রাখা এবং নিজের মতো করে বিচার না করে তার দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা। কখনও কখনও একটি বাক্য- “আমি তোমার কথাটা বুঝতে পারছি”-বড় কোনো ঝগড়াও থামিয়ে দিতে পারে।

যোগাযোগের অভাবই সবচেয়ে বড় শত্রু?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সম্পর্ক ভাঙে ভালোবাসার অভাবে নয়, যোগাযোগের অভাবে। অনেক দম্পতি একই ছাদের নিচে থাকলেও দিনের পর দিন নিজেদের অনুভূতি নিয়ে কথা বলেন না। কষ্ট জমতে থাকে, ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, আর একসময় সম্পর্কের দূরত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শুধু একে অপরের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কাপল কাউন্সিলিং- শেষ ভরসা নয়, সময়মতো নেওয়া একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশে এখনও অনেকের ধারণা, কাউন্সিলিং মানেই মানসিক রোগের চিকিৎসা। অথচ বাস্তবতা হলো, কাপল কাউন্সিলিং এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ স্বামী-স্ত্রীকে নিজেদের সমস্যা বুঝতে, যোগাযোগ উন্নত করতে এবং সমাধানের পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করেন। ঘন ঘন ঝগড়া, বিশ্বাসের সংকট, আর্থিক বিষয় নিয়ে বিরোধ, সন্তান লালন-পালনে মতবিরোধ কিংবা দূরত্ব তৈরি হলে কাপল কাউন্সিলিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সব সম্পর্ক অবশ্য কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। যদি সম্পর্কে শারীরিক নির্যাতন, গুরুতর মানসিক সহিংসতা বা সম্পর্ক ঠিক করার কোনো ইচ্ছাই না থাকে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তবে অনেক সম্পর্কেই সময়মতো কাউন্সিলিং বড় ধরনের ভাঙন ঠেকাতে সাহায্য করে।

সংসার টিকিয়ে রাখতে আর কী কী প্রয়োজন?

বিশ্বাস: বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করতে দীর্ঘ সময় লাগে।

সম্মান: ভালোবাসা কমতে পারে, কিন্তু সম্মান থাকলে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।

ক্ষমা করার মানসিকতা: ভুল মানুষেরই হয়। ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা করতে শেখা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।

একসঙ্গে সময় কাটানো: ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় শুধু দুজনের জন্য রাখুন। সম্পর্কের উষ্ণতা বজায় রাখতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আর্থিক স্বচ্ছতা: আয়-ব্যয়, সঞ্চয় কিংবা ঋণের বিষয় গোপন না করে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।

ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান: স্বামী-স্ত্রী হলেও প্রত্যেকের নিজস্ব সময়, শখ ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের মূল্য আছে।

যে ভুলগুলো অজান্তেই সম্পর্ককে দুর্বল করে!

-সবসময় সমালোচনা করা
-অন্যের সঙ্গে তুলনা করা
-ধন্যবাদ বা দুঃখিত বলতে কার্পণ্য করা
-রাগের মাথায় অপমানজনক কথা বলা
-পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে সঙ্গীকে ছোট করা
-মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো
-ছোট সমস্যাকে বড় করে দেখা
-সুখী দাম্পত্যের ছোট ছোট অভ্যাস। সুখী সংসারের জন্য প্রতিদিন বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। বরং ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন- একসঙ্গে খাবার খাওয়া, প্রতিদিন কিছু সময় গল্প করা, একে অপরের কাজের প্রশংসা করা, বিশেষ দিন মনে রাখা, প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

সংসার টিকিয়ে রাখার কোনো জাদুর মন্ত্র নেই। এটি প্রতিদিনের যত্ন, বিশ্বাস, সম্মান, ধৈর্য এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মতভেদ হবেই, ভুলও হবে। কিন্তু যে দম্পতি সমস্যাকে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে না দেখে, বরং একসঙ্গে সমাধানের চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন, তারাই দীর্ঘমেয়াদে সুখী দাম্পত্য গড়ে তুলতে পারেন।

আর যখন মনে হবে নিজেদের চেষ্টায় সমাধান সম্ভব হচ্ছে না, তখন কাপল কাউন্সিলিং নেওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত। কারণ, একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আগে যদি তা বাঁচানোর সুযোগ থাকে, তবে সেই সুযোগ গ্রহণ করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

কাপল কাউন্সিলিংপারস্পরিক বোঝাপড়াবন্ধনবিয়েসংসার