বিধবা নারীদের জীবন: সংগ্রাম, বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের লড়াই

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ২৩ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিবসটি এখনও খুব একটা আলোচনায় আসে না। অথচ দেশের লাখো নারীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দিবসের তাৎপর্য। স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেক বিধবা নারীর জীবন হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রামের নাম।
সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫২ লাখ বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারী রয়েছেন, যা দেশের মোট বিবাহিত নারীর প্রায় ৯.৫ শতাংশ। এদের বড় একটি অংশের নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক বিধবা নারীর জমির মালিকানা নেই, তারা অনিয়মিত ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য হন।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্ত ও অসহায় নারীদের জন্য ভাতা কর্মসূচি চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও অসহায় নারীদের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা হলো, এই ভাতার পরিমাণ এতটাই কম যে একজন নারীর ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো জরুরি।
সরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৭১.৭ শতাংশ বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারী দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামীহীন জীবনযাপন করছেন। এদের মধ্যে ৬০.৬ শতাংশ নারী নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। আবার ৯৬.১ শতাংশ নারী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ভাতার অর্থ ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় এখনও অধিকাংশ পরিবারে পুরুষ সদস্যই প্রধান উপার্জনকারী। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক নারী হঠাৎ করেই আয়ের প্রধান উৎস হারিয়ে ফেলেন। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক নারী কর্মদক্ষতা অর্জনের আগেই সংসারজীবনে প্রবেশ করেন। তাই স্বামী হারানোর পর সন্তানদের নিয়ে তাদের অনেকেই চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যান।এর সঙ্গে যুক্ত হয় সম্পত্তি থেকে বঞ্চনার বিষয়টি।
আইনগতভাবে স্বামীর সম্পত্তিতে অংশীদার হলেও বাস্তবে অনেক বিধবা নারী জমি, বাড়ি কিংবা অন্যান্য সম্পদের ন্যায্য অংশ পান না। আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নানা কৌশলে তাদের অধিকার দখল করে নেন। কোথাও কোথাও দেবর বা ভাশুরেরাও সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করেন।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক বৈষম্যও বিধবাদের জীবনের একটি বড় বাস্তবতা। অনেক এলাকায় এখনও তাদের দুর্বল, অসহায় কিংবা পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেক বিধবা নারীকে দূরে রাখা হয়। কুসংস্কার ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের আরও কোণঠাসা করে তোলে।
বিধবাদের পুনর্বিবাহ নিয়েও সমাজে নানা বাধা রয়েছে। বিপত্নীক পুরুষের পুনর্বিবাহকে যেখানে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে বিধবা নারীর নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্তকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। কোথাও কোথাও তাদের নিয়ে অমানবিক কুসংস্কারও প্রচলিত রয়েছে, যা তাদের সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
অর্থনৈতিক সংকট, একাকিত্ব, সামাজিক অবহেলা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক বিধবা নারী দীর্ঘমেয়াদি শোক, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। বয়স্ক নারীরা আরও বেশি নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে তাদের শারীরিক অবস্থাও ক্রমেই অবনতির দিকে যায়।
নিরাপত্তাহীনতাও তাদের জীবনের বড় একটি সমস্যা। একাকী বসবাসকারী অনেক নারী শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সম্পত্তি দখলের হুমকির মুখে থাকেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিধবারা উচ্ছেদ, উত্তরাধিকার বঞ্চনা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশও এ বাস্তবতার বাইরে নয়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। পরিবারে বিধবা নারীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, পুনর্বিবাহে বাধা অপসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং আইনি সহায়তা বাড়ানো জরুরি। বিধবা নারীরা কারও করুণার পাত্র নন। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।
আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসের মূল বক্তব্য —একজন নারীর পরিচয় শুধু তার স্বামীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। তিনি নিজেই একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার রয়েছে সম্মান, অধিকার ও সম্ভাবনা। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে বিধবা নারীদের প্রতি বৈষম্য ও কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই হতে হবে আমাদের অঙ্গীকার।



