বাবা: জীবনের এক বটবৃক্ষ

জীবনের পথে আমরা অনেক মানুষের সান্নিধ্য পাই, অনেক সম্পর্কের ছায়ায় বড় হয়ে উঠি। কিন্তু কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো এতটাই গভীর ও নিঃস্বার্থ যে সেগুলোকে কোনো সংজ্ঞার মধ্যে আটকে রাখা যায় না। বাবা তেমনই এক সম্পর্ক। তিনি শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি জীবনের এক বটবৃক্ষ- যার বিশাল ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা নিরাপত্তা, সাহস আর আশ্রয়ের অনুভূতি পাই।
আজ বাবা দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ তাদের বাবাদের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। কিন্তু সত্যি বলতে, বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কি একটি দিনই যথেষ্ট? যে মানুষটি আমাদের জন্মের পর থেকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে নীরবে পাশে থেকেছেন, তাঁর অবদান কি কখনো একটি দিনের উদযাপনে সীমাবদ্ধ রাখা যায়?

বাবাদের ভালোবাসা অনেক সময় মায়ের মতো প্রকাশ্য নয়। তাঁরা কম কথা বলেন, আবেগ কম দেখান, কিন্তু দায়িত্ব পালন করেন নিঃশব্দে। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে, পরিবারের চাহিদা মেটাতে কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তাঁরা দিনের পর দিন সংগ্রাম করে যান। অনেক সময় নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা শখগুলোও বিসর্জন দেন পরিবারের জন্য।
শৈশবে বাবার আঙুল ধরে হাঁটতে শেখা থেকে শুরু করে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত- বাবা যেন এক অদৃশ্য শক্তি। সাইকেল চালানো শেখানোর সময় পেছন থেকে সিট ধরে রাখা সেই হাত, পরীক্ষার ফলের আগে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করা মানুষটি কিংবা অসুস্থ সন্তানের পাশে নির্ঘুম রাত কাটানো অভিভাবক- সবখানেই বাবার ভালোবাসা ছড়িয়ে থাকে।
আমাদের সমাজে বাবাদের প্রায়ই দেখা হয় পরিবারের উপার্জনকারী সদস্য হিসেবে। কিন্তু একজন বাবার পরিচয় শুধু এতটুকু নয়। তিনি একজন শিক্ষক, বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং অনেক সময় সন্তানের প্রথম নায়ক। সন্তানের কাছে বাবাই হয় সততা, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার প্রথম পাঠশালা।

বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে। ছোটবেলায় যাঁকে আমরা সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ মনে করি, কৈশোরে কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে মতের অমিল তৈরি হয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শিখি, বাবার কঠোরতার আড়ালেও ছিল সীমাহীন মমতা। যেসব নিষেধাজ্ঞা একসময় বিরক্তিকর মনে হতো, সেগুলোর পেছনেও ছিল সন্তানের নিরাপত্তা আর কল্যাণের চিন্তা।
অনেক বাবার জীবন কেটে যায় নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে। নতুন পোশাক কেনার আগে সন্তানের বই কেনা, নিজের চিকিৎসার খরচ বাঁচিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো কিংবা অবসরের বয়সেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া- এসব গল্প আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। এসব গল্পের বেশিরভাগই কখনো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, কিন্তু সেগুলোই একজন বাবার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।
বর্তমান সময়ে বাবা হওয়ার ধারণাতেও এসেছে পরিবর্তন। আগের প্রজন্মের বাবারা যেখানে আবেগ প্রকাশে সংযত ছিলেন, এখন অনেক বাবাকে দেখা যায় সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে তুলতে। সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, রান্নাঘরের কাজে সহায়তা করা কিংবা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন থাকা- আধুনিক পিতৃত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে- সন্তানের জন্য বাবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
বাবা দিবস শুধু উপহার দেওয়ার দিন নয়; এটি স্মরণ করার দিন। অনেকেই হয়তো আজ বাবার সঙ্গে সময় কাটাবেন, কেউ ফোন করে খোঁজ নেবেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করবেন। আবার এমনও অনেকে আছেন, যাঁদের বাবা আর পৃথিবীতে নেই। তাঁদের জন্য এই দিনটি স্মৃতি আর আবেগের। বাবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই তখন হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আমরা প্রায়ই মনের কথা প্রকাশ করতে দেরি করে ফেলি। বাবাকে ভালোবাসি- এই সাধারণ বাক্যটুকুও অনেকের বলা হয়ে ওঠে না। অথচ বাবা হয়তো কোনো বড় উপহারের অপেক্ষায় থাকেন না; সন্তানের একটি ফোনকল, একটু সময় কিংবা আন্তরিক কৃতজ্ঞতাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বটবৃক্ষ যেমন ঝড়-ঝাপটা সামলে চারপাশকে আশ্রয় দেয়, বাবাও তেমনি জীবনের প্রতিকূলতা নিজের কাঁধে নিয়ে পরিবারকে আগলে রাখেন। তাঁর ছায়া সবসময় চোখে পড়ে না, কিন্তু সেই ছায়ার অস্তিত্ব আমরা টের পাই প্রতিটি নিরাপদ মুহূর্তে, প্রতিটি অর্জনে, প্রতিটি সাহসে।
এই বাবা দিবসে তাই শুধু উদযাপন নয়, কৃতজ্ঞতারও সময়। সেই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময়, যিনি হয়তো কখনো নিজের কথা ভাবেননি, কিন্তু সারাজীবন ভেবেছেন আমাদের কথা। কারণ, জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়গুলোর একটি হলো বাবা- জীবনের এক চিরসবুজ বটবৃক্ষ।



