চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রিটিশদের দুর্গ জয় করা এক বাঙালি নারী

একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞান ছিল প্রায় পুরোপুরি পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপের নামকরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত, আর নেতৃত্বের আসনে বসা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেই কঠিন বাস্তবতায় অবিভক্ত বাংলার এক নারী চিকিৎসক সাহস, মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ইতিহাসে নিজের নাম লিখে যান। তিনি ডা. যামিনী সেন।
১৮৭১ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া যামিনী সেন শুধু একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন সামাজিক বাধা ভাঙার এক উজ্জ্বল প্রতীক। কবি কামিনী রায়-এর ছোট বোন হিসেবে পরিচিত হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অর্জন তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৮৯৭ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর কর্মজীবনের শুরুতেই পাড়ি জমান নেপালে। সেখানে রাজপরিবারের চিকিৎসক এবং কাঠমান্ডুর জেনানা হাসপাতালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রায় এক দশক। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তিনি রাজা পৃথ্বী বীর বিক্রম শাহ-এর আস্থা অর্জন করেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি আসে ব্রিটেনে। ১৯১১ সালে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইউরোপে গিয়ে তিনি ডাবলিনে চিকিৎসা লাইসেন্স লাভ করেন এবং পরে লন্ডনে জনস্বাস্থ্য ও ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি গ্লাসগোর ঐতিহাসিক Royal College of Physicians and Surgeons of Glasgow-এর ফেলোশিপ পরীক্ষায় অংশ নেন।
১৫৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রবেশাধিকার তখনো নতুন। ১৯১২ সালে যামিনী সেন কৃতিত্বের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলেজটির ইতিহাসে প্রথম নারী ফেলো হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; বরং চিকিৎসা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
বিদেশে সাফল্য অর্জনের পর তিনি ভারতে ফিরে উইমেনস মেডিকেল সার্ভিসে যোগ দেন। আগ্রা, শিমলা ও পুরিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন। মহামারির সময় কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখেন। স্থানীয় মানুষ তাঁকে স্নেহভরে ডাকতেন ‘শাড়িওয়ালি ডাক্তারিন সাহেব’ নামে।
চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি জীবনযাপনেও ছিল তাঁর স্বাতন্ত্র্য। হাসপাতালে কাজের সুবিধার্থে তিনি পিন দিয়ে আটকানো শাড়ি ও ফুলহাতা ব্লাউজ পরতেন, যা সে সময়ের নারীদের পোশাকধারায় এক নতুন বাস্তবধর্মী দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল।
ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে কম সংগ্রাম করতে হয়নি। নেপালে কর্মরত অবস্থায় তিনি এক কন্যাশিশুকে দত্তক নেন। শিশুটির নাম ছিল ভুটু। কিন্তু অল্প বয়সেই ভুটুর মৃত্যু যামিনী সেনকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।
ঔপনিবেশিক ভারতের বর্ণবৈষম্য এবং ব্রিটেনের লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যামিনী সেন প্রমাণ করেছিলেন যে যোগ্যতার কোনো লিঙ্গ নেই। ১৯৩২ সালে তাঁর জীবনাবসান হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি রয়ে গেছেন এক অনন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে।
আজ যখন নারীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসা ও গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন স্মরণ করা প্রয়োজন সেই বাঙালি নারীকে, যিনি এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটিশ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে নতুন পথের সূচনা করেছিলেন- ডা. যামিনী সেন।



