ক্যাসেট শুনেই ৮২ বছর বয়সে কোরআনের হাফেজা মরিয়ম

কোরআনের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবও যে সম্ভব হয়ে উঠতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন হাজিয়া মরিয়ম আর-রামিমাহ। ইয়েমেনের এই ৮২ বছর বয়সী নারী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই, শুধুমাত্র শুনে শুনেই পুরো পবিত্র কোরআনুল কারিম মুখস্থ করে হাফেজা হয়েছেন। তার এই অর্জন এখন ইয়েমেন–জুড়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের তায়েজ প্রদেশ–এর সাবির পর্বতের ঢালে অবস্থিত হাদনান গ্রামে জন্ম মরিয়মের। যে সময়ে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তখন গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। অন্য সাধারণ নারীদের মতো সংসার সামলানো আর কৃষিকাজ করেই কেটেছে তার জীবনের বড় অংশ। কিন্তু ব্যস্ততার আড়ালে হৃদয়ে লুকিয়ে ছিল এক অসম্ভব স্বপ্ন— লেখাপড়া না জেনেও পুরো কোরআন মুখস্থ করা।
২০০৬ সালে, জীবনের ষাটের ঘরে পা দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার ছেলে শায়খ মুখতার আর-রামিমাহ গ্রামে একটি কোরআন হিফজ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন যাত্রা। খাতা-কলম ছিল না, কিন্তু ছিল অসাধারণ শ্রবণশক্তি আর অটল সংকল্প।
গ্রামের এক নারী শিক্ষিকার সহায়তায় তিনি সূরা শেখা শুরু করেন। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর তেলাওয়াতের আসরে গিয়ে আগের দিনের মুখস্থ অংশ শুনাতেন, নতুন আয়াত শিখতেন। এরপর মাগরিব ও ইশার মাঝখানে ক্যাসেট রেকর্ডারে শায়খ ফারেস আব্বাদ–এর তেলাওয়াত শুনতেন গভীর মনোযোগে। ফজরের আগেও ঘুম থেকে উঠে আবার শুনতেন সেই আয়াত, ধীরে ধীরে গেঁথে নিতেন নিজের অন্তরে।
এই দীর্ঘ পথ মোটেও সহজ ছিল না। একজন নিরক্ষর মানুষের জন্য সমার্থক আয়াত মনে রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কোরআনের সূরা তওবা ও সূরা রা’দ মুখস্থ করার সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। তবে বারবার অনুশীলন আর পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সব বাধা অতিক্রম করেন তিনি। কোরআনের সব সূরার মধ্যে সূরা বাকারা ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়।
টানা ১০ বছরের নিরলস সাধনার পর ২০১৬ সালে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। শেষ আয়াত তেলাওয়াত সম্পন্ন করার পর আবেগে কেঁদে ফেলেন মরিয়ম। বছরের পর বছরের পরিশ্রম শেষে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। সেই মুহূর্তে এক সাধারণ বৃদ্ধা থেকে তিনি হয়ে ওঠেন অসাধারণ এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
মরিয়মের এই অর্জন শুধু তাকে নয়, গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে তার পরিবারকেও। তার ২১ সন্তান ও নাতি-নাতনিদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী। কিন্তু তাদের কাছেও সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল— পরিবারের অনপড় এই নারী শুধুমাত্র শুনে শুনেই পুরো কোরআন মুখস্থ করেছেন, যা অনেক শিক্ষিত মানুষের পক্ষেও সম্ভব হয় না।
তার হিফজের বড় একটি সময় কেটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের কঠিন বাস্তবতায়। কামানের শব্দ, সম্পদের সংকট, বিদ্যুৎহীন রাত-কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। অন্ধকার ঘরে তেলাওয়াত আর অটল সংকল্পই হয়ে উঠেছিল তার আলোর উৎস।
বর্তমানে বয়সের ভার ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে তার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিছু আয়াত ভুলেও যাচ্ছেন। তবুও শয্যাশায়ী এই বৃদ্ধার ঠোঁট এখনও আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত। তার জীবনের গল্প আজ মনে করিয়ে দেয়— সত্যিকারের ইচ্ছাশক্তি থাকলে বয়স, শিক্ষা কিংবা প্রতিকূলতা কখনোই শেষ কথা নয়।



