বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬
বিনোদন

৯ বছরেই থেমেছিল পড়াশোনা, এরপরই শুরু কিংবদন্তি শাবানার গল্প

f9e89b0c-1179-4a25-a884-24d977fc8c18

মাত্র ৯ বছর বয়সেই থেমে যায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। কিন্তু জীবনের সেই অকাল বিরতিই যেন খুলে দেয় অন্য এক পথ। যে পথ ধরে আফরোজা সুলতানা রত্না নামের এক কিশোরী একদিন হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা। অভিনয় দক্ষতা, পর্দায় অনবদ্য উপস্থিতি আর অসাধারণ সৌন্দর্যের কারণে দর্শকের ভালোবাসায় তিনি পেয়েছিলেন ‘ঢালিউডের বিউটিকুইন’ খ্যাতি।

১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাবানা। তার বাবা ফয়েজ চৌধুরী ও মা ফজিলাতুন্নেসা। ছোটবেলাতেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার।

১৯৬২ সালে পরিচালক আজিজুর রহমান–এর হাত ধরে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় তার। প্রথম অভিনয় করেন পরিচালক এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ সিনেমায়। এরপর নৃত্যশিল্পী হিসেবেও কাজ করেন কিছুদিন।

অভিনয় শুরু করার মাত্র পাঁচ বছর পরই নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে পাকিস্তানি অভিনেতা নাদিম–এর বিপরীতে অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমেই তার নাম বদলে রাখা হয় ‘শাবানা’। আর সেই নামেই তিনি জায়গা করে নেন চলচ্চিত্র ইতিহাসে।

বাংলা চলচ্চিত্রে তাকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত কথা রয়েছে-‘সেলাই মেশিন মানেই শাবানা’। কারণ, অসহায় নারী, সংগ্রামী স্ত্রী কিংবা মায়ের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল এতটাই বাস্তবসম্মত যে দর্শকের মনে তা স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। বহু সিনেমায় তাকে দেখা গেছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সন্তান মানুষ করতে সেলাইয়ের কাজ করতে। এভাবেই সেলাই মেশিন যেন হয়ে ওঠে তার অভিনয় জীবনের এক প্রতীক।

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনাতেও সফল ছিলেন শাবানা। ১৯৭৯ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এস এস প্রোডাকশন্স-এর ব্যানারে নির্মাণ করেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘মাটির ঘর’। পরিচালক আজিজুর রহমানের এ ছবিতে তার সঙ্গে অভিনয় করেন কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক। ছবিটি দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যবসায়িক সফলতাও পায়।

১৯৮৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ‘বিরোধ’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনায় আসেন তিনি। এতে তার বিপরীতে ছিলেন বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজেশ খান্না। পরে ছবিটি হিন্দিতে ‘শত্রু’ নামে মুক্তি দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকাদের সঙ্গেও সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ১৯৮৯ সালে ইউনিসেফ–এর শুভেচ্ছাদূত এবং হলিউড তারকা অড্রে হেপবার্ন বাংলাদেশ সফরে এসে এফডিসি পরিদর্শনের সময় শাবানাসহ কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৪ সালে সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ওয়াহিদ সাদিককে বিয়ে করেন শাবানা। পরে তারা যৌথভাবে গড়ে তোলেন এস এস প্রোডাকশন্স। তাদের সংসারে দুই মেয়ে সুমি ও ঊর্মি এবং এক ছেলে নাহিন রয়েছেন।

পুরস্কারের দিক থেকেও তিনি অনন্য। ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পান। এরপর ক্যারিয়ারে মোট ১১ বার সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেন, যা এখনো বাংলাদেশের কোনো অভিনেত্রীর সর্বোচ্চ অর্জন। তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।

১৯৯৯ সালে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়িয়ে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন শাবানা। যদিও তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ মুক্তি পায় ২০০১ সালে। পরিচালক আজিজুর রহমানের এই ছবিই ছিল শাবানা ও আলমগীর জুটির শেষ সিনেমা। বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি জুটি বেঁধে অভিনয়ের রেকর্ডও রয়েছে তাদের দখলে।

মোট ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন শাবানা, যার মধ্যে ১৩০টিতেই সহশিল্পী ছিলেন আলমগীর। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ বাংলাদেশে এলেও ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পর আর দেশে আসেননি তিনি।

পর্দা থেকে দূরে থাকলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, আর দর্শকের স্মৃতিতে, শাবানা আজও এক অমলিন কিংবদন্তি।

চলচ্চিত্রশাবানা