মেয়েকে ছাড়া প্রথম বিশ্বকাপ, বাবার হৃদয়ে আজও বেঁচে কারিনা

২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ বাবা-মেয়ে একসঙ্গে দেখেছিলেন। চার বছর পর বিশ্বকাপ আবার এসেছে, কিন্তু পাশে নেই একমাত্র মেয়ে কারিনা। মাত্র ৩১ বছর বয়সে চলে যাওয়া মেয়ের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে ফুটবলের মহোৎসব দেখছেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কায়সার হামিদ। বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাস আর ব্যক্তিগত শোক মিলেমিশে তাঁর কাছে তৈরি করেছে এক ভিন্ন অনুভূতির গল্প।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়; এটি আবেগ, উন্মাদনা, স্মৃতি আর মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের নাম। মাঠে ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াইয়ের বাইরে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে কোটি মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ। কারও কাছে এটি আনন্দের উপলক্ষ, কারও কাছে প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ। বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কায়সার হামিদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ তেমনই এক বেদনাময় স্মৃতির নাম।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা কায়সার হামিদ। দেশের ফুটবলপ্রেমীরা তাঁকে দেখেছেন মাঠ কাঁপাতে, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক ছড়াতে। কিন্তু মাঠের সেই দুর্দান্ত ফুটবলার আজ একজন শোকাহত বাবা। কারণ এবারের বিশ্বকাপ তাঁকে দেখতে হচ্ছে তাঁর একমাত্র কন্যা কারিনা কায়সারকে ছাড়া।
মাত্র ৩১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কারিনা। অকালে হারিয়ে যাওয়া এই তরুণীর স্মৃতি আজও প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে ফেরে তাঁর পরিবারকে। বিশেষ করে যখন আসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ, তখন সেই শূন্যতা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
গত বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে বাবা-মেয়ে একসঙ্গে বসে খেলা দেখেছিলেন। ফুটবল নিয়ে আলোচনা, প্রিয় দলকে সমর্থন, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে তর্ক- সবকিছুতেই ছিল কারিনার প্রাণবন্ত উপস্থিতি। ফুটবলপ্রেমী বাবার জীবনে মেয়েটি শুধু সন্তানই ছিল না, ছিল একজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গীও।
বিশ্বকাপ এলেই কায়সার হামিদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান, আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং ফুটবলসংক্রান্ত আয়োজনের পাশাপাশি বাসায় ফিরে মেয়ের সঙ্গে খেলা দেখা ছিল তাঁর সবচেয়ে আনন্দের সময়গুলোর একটি। কিন্তু এবার সেই জায়গাটিই ফাঁকা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে কায়সার হামিদ লিখেছেন, বিশ্বকাপের খেলা দেখতে গিয়ে বারবার তাঁর মেয়ের কথা মনে পড়ছে। প্রতিটি মুহূর্তে যেন তিনি কারিনার অনুপস্থিতি অনুভব করছেন। আগে যে আনন্দ নিয়ে খেলা দেখতেন, এবার সেই আনন্দের ভেতর মিশে আছে গভীর বেদনা।
জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের উপস্থিতি কখনও মুছে যায় না। তারা থেকে যায় স্মৃতিতে, অভ্যাসে, প্রতিটি বিশেষ দিনে। কারিনাও তেমনই একজন। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল, প্রতিটি উদযাপন যেন বাবার মনে করিয়ে দেয়-একজন মানুষ নেই, যিনি একসময় এই আনন্দের সবচেয়ে বড় অংশীদার ছিলেন।
কায়সার হামিদের পোস্টে ফুটে উঠেছে একজন বাবার অসহায় ভালোবাসা। তিনি লিখেছেন, গত বিশ্বকাপে কারিনার সঙ্গে করা একটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে। তখন কল্পনাও করেননি, পরের বিশ্বকাপ এলে মেয়েটি আর পাশে থাকবে না। এমন উপলব্ধি যে কোনো বাবার জন্যই অসহনীয়।
ফুটবলের ভাষায় জয়-পরাজয়ের হিসাব থাকে। কিন্তু জীবনের কিছু হারানোর কোনো বিকল্প নেই, কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। কোটি দর্শকের উল্লাসের মাঝে কায়সার হামিদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ তাই কেবল ফুটবলের উৎসব নয়; এটি এক প্রিয় মুখকে মনে করার সময়, এক অপূর্ণতার গল্প, এক বাবার নীরব কান্নার নাম।
বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চে যখন নতুন নায়ক জন্ম নেয়, নতুন ইতিহাস রচিত হয়, তখন ঢাকার কোনো এক ঘরে বসে একজন বাবা হয়তো স্মরণ করেন তাঁর মেয়েকে- যে মেয়েটি ফুটবল ভালোবাসত, বাবার পাশে বসে খেলা দেখত, আর যার অনুপস্থিতি আজও প্রতিটি বিশ্বকাপের রাতে আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
কারিনা নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আছে। আর সেই স্মৃতিই হয়তো কায়সার হামিদের কাছে আজীবন সবচেয়ে মূল্যবান সঙ্গী হয়ে থাকবে।



