এত বৃষ্টির পরও কেন কমছে না গরম? জানালেন আবহাওয়াবিদরা

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরমের হাত থেকে এখনো স্বস্তি মিলছে না। বরং অনেকের অভিযোগ, বৃষ্টির পর বাতাস আরও ভারী ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে- এত বৃষ্টি হওয়ার পরও কেন তাপমাত্রা বা গরমের অনুভূতি কমছে না?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে ১১৪ মিলিমিটার এবং নোয়াখালীর মাইজদীতে ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাতেও রাতভর বৃষ্টির দেখা মিলেছে। রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

তবে এত বৃষ্টির পরও মানুষের মধ্যে স্বস্তির বদলে অস্বস্তি বেশি অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মৌসুমি বৃষ্টির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বৃষ্টিকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- ‘শীতল বৃষ্টি’ এবং ‘উষ্ণ বৃষ্টি’। গ্রীষ্মের শুরুতে কিংবা মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগে যে কালবৈশাখী বা বজ্রবৃষ্টিগুলো হয়, সেগুলো সাধারণত বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচু স্তরে সৃষ্টি হয়। ফলে ওই বৃষ্টির পানি অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে এবং তা ভূমির কাছাকাছি থাকা গরম বাতাসকে দ্রুত শীতল করে দেয়। এ কারণেই ওই সময়ের বৃষ্টির পরপরই তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কিন্তু জুন মাসে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন যে বৃষ্টি হয়, তাকে আবহাওয়াবিদরা ‘উষ্ণ বৃষ্টি’ বলে থাকেন। এই বৃষ্টি বায়ুমণ্ডলের অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরে সৃষ্টি হয় এবং এর পানির তাপমাত্রাও তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে বৃষ্টির পরও বাতাস খুব বেশি ঠান্ডা হয় না। উল্টো বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, যার কারণে মানুষ আরও বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভব করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও আর্দ্রতা বেড়ে গেলে শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না। এ কারণেই অনেক সময় ৩০ বা ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাও ৩৫ ডিগ্রির মতো অনুভূত হতে পারে। বর্তমান বৃষ্টিপাতের পেছনেও রয়েছে একটি বিশেষ আবহাওয়াগত কারণ। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো লঘুচাপের প্রভাবে হচ্ছে না। দেশের মধ্যাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলের ওপরের বায়ুমণ্ডলে একটি ঘূর্ণিবাতাস (সাইক্লোন সার্কুলেশন) তৈরি হয়েছে। এই ঘূর্ণিবাতাসের প্রভাবেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে।
সাধারণত যখন বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তর এবং ভূপৃষ্ঠ-উভয় জায়গায় ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়, তখন সেটিকে লঘুচাপ বলা হয়। বর্তমানে ঘূর্ণন কেবল ওপরের স্তরে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এটি পরবর্তীতে লঘুচাপে রূপ নিতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে সক্রিয় ঘূর্ণিবাতাসটি ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে কুষ্টিয়া ও রাজশাহী অঞ্চলের দিকে যেতে পারে। এর প্রভাবে আজ এবং আগামীকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। যদিও এরপর বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হলেও রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহ এমন বিক্ষিপ্ত থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৃষ্টি মানেই যে গরম থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি মিলবে, এমন নয়। বিশেষ করে মৌসুমি ‘উষ্ণ বৃষ্টি’র সময় তাপমাত্রার চেয়ে আর্দ্রতাই মানুষের অস্বস্তির প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। তাই আকাশ মেঘলা আর টানা বৃষ্টি থাকলেও ভ্যাপসা গরম থেকে পুরোপুরি স্বস্তি পেতে এখনো কিছুটা অপেক্ষা করতে হতে পারে।



