Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হোটেল-রেস্তোরাঁ: নারী উদ্যোক্তা-কর্মীর সংকটের শেষ কোথায়

করোনা মহামারির ভেতরই নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করেছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। অনলাইন ফুড ডেলিভারির বদৌলতে ঢিমেতালে চললেও আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছে রেস্টুরেন্টগুলো। সচরাচর তরুণ উদ্যোক্তারা রেস্টুরেন্ট সেবার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। সব সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় এই খাতেই নিজের ব্যবসাকে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ বেশি। কেউ ফুডকার্ট, কেউ ক্যাফে; কেউ রীতিমতো বড় জায়গা ভাড়া নিয়ে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনার চেষ্টা করছেন।

এতকিছুর পরও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তা ও কর্মীর সংখ্যা নিতান্তই কম। অনলাইন কিংবা মিডিয়ায় প্রায়ই রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নারীদের আগ্রহ কিংবা সফল উদ্যোক্তাদের গল্প শোনা যায়। সমস্যা হলো, এসব উদ্যোগের গল্প কিংবা খবর আমাদের পুরো খাত সম্পর্কে বিশদ ধারণা দিতে পারে না।

ভালোমতো সবকিছু পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। হ্যাঁ, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা খোলার ক্ষেত্রে অনেক নারীকেই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই খাতকে শুধু মালিক বা উদ্যোক্তা দিয়ে বিচার করাটা ভুল।

নারীর জগৎটা সবসময় বিস্তৃত। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিচারে নারীকে সবকিছু সামলে নিজের উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হয়। আর রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নিজের পুরোটাই উজাড় করে দিতে হয়। সারাদিন রেস্টুরেন্টে কাস্টমারদের সেবা দেওয়ার পর আবার পরের দিনের প্রস্তুতি সাড়ার ব্যাপারটা ভুললে চলবে না। শ্রমের হিসেবে দিনে অন্তত ১৪-১৬ ঘণ্টা অবশ্যই প্রস্তুতি ও সেবা প্রদানেই চলে যায়।

একজন উদ্যোক্তা বা মালিক এই কাজগুলো পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু যখন নারী কর্মী হিসেবে এখানে অংশগ্রহণ করেন, তখন তার দিনের বিশাল একটি অংশ এখানেই কেটে যায়। কিন্তু শ্রমের তুলনায় তার বেতন অনেক কম।

ধীরে ধীরে নারী শেফের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে

রেস্টুরেন্টের হেঁসেলের দিকে হয়তো আমাদের তাকানোর সুযোগ হয় না ভালোভাবে। হোটেল, পার্টি সেন্টার অথবা কমিউনিটি সেন্টারের রান্নাঘরের পরিবেশ ক্যাফে কিংবা বড় রেস্টুরেন্টের মতো হয় না। এই খাতে বাংলাদেশে বিশাল একটি অংশ হোটেল কিংবা পার্টি সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা অনেক বড় হলেও নারী কর্মীদের এখানে ঠাই সীমিত কিছু জায়গায়। কাটাকুটি মশলা বাটা কিংবা পরিষ্কারের কাজগুলোই তাদের বেশি করতে হয়। সচরাচর পুরুষরা বাবুর্চি, সরঞ্জাম আনা নেওয়া অথবা ওয়েটারের কাজ করে থাকেন।

অধিকাংশ সময়ে দিনে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মজুরি পান নারীকর্মীরা। যেহেতু তাদের বেশিরভাগই নিরক্ষর ও আয়ের যথাযথ উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন, সেহেতু তারা দিনের পর দিন এমন পরিশ্রমের কাজ করে যান। মশলা বাটার কাজটা অনেক সময় তাদের পাটাতেই সারতে হয়। আবার কাটাকুটি ও সারাদিন পানি নিয়ে কাজ করায় হাতে ফোস্কা পড়া, কেটে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার মাঝেই কাজ করতে হয়। কাজ না করলে তো আর টাকা মিলবে না। আর কোনোদিন ভুলে কাজে না এলে টাকা তো মিলবেই না; পরন্তু লাঞ্ছনাও জুটবে। নারীদের এখানে যে শুধু মালিকপক্ষ থেকেই কটুকথা শুনতে হয় তা কিন্তু নয়। বাবুর্চি কিংবা ওয়েটারের পদটি বেশ উচুদরের হওয়ায় বুয়াকে গালাগালের অধিকার তারাও কিছুটা রাখে।

অনেক ক্ষেত্রে হোটেলে বাজে প্রস্তাব কিংবা বাজেভাবে নারীর গায়ে হাত দেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটে। নিম্নবিত্ত পরিবারের এই নারীদের এই কাজগুলোকে সমাজ খুব ভালোভাবে দেখে না। তাদের নিয়ে নানা রসালো গল্প চালু হয়ে যায়। এতে পরিবারেও অশান্তি। সামাজিক সম্মান না কি পেটের ক্ষুধা? পেটের ক্ষুধাই জয়ী হয়। এক হোটেল ছেড়ে আরেক হোটেলে কাজ খুঁজে নিতে চায় এই নারীরা।

এ তো গেলো হোটেল কিংবা পার্টি সেন্টারের কথা। এবার আসা যাক ক্যাফে কিংবা রেস্টুরেন্টে। এখানকার পরিবেশ অনেকটাই গোছানো হয়ে থাকে। সামান্য কিছু কর্মী নিয়ে উদ্যোক্তারা কাজ চালিয়ে যান। রেস্টুরেন্টে অধিকাংশ সময়েই একজন শেফ থাকেন। ধীরে ধীরে নারী শেফের চাহিদাও বাড়তে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বেশ কিছু উদ্যোক্তাদের দেখা যাচ্ছে যেখানে নারীরাই সবকিছু পরিচালনা করছেন। তবে সেই সংখ্যা কম।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা অনেক বড় হলেও নারী কর্মীদের এখানে ঠাই সীমিত কিছু জায়গায়

আশার কথা হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা একজোট হয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় আসছেন। নিজের সংস্কৃতিকে পরিচিত করছেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নারী শেফদের অংশগ্রহণ হতাশাজনক। তারা বরং ঘরেই ক্যাটারিং সার্ভিসে বেশি আগ্রহী। কেউ ঘরে কেক, চকলেট বা অন্যান্য খাবার তৈরি করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিক্রি করেন। কিন্তু রেস্টুরেন্টে সহজে অংশ নিতে চান না। এর কারণ নিজের ঘর সামলে আবার রেস্টুরেন্টে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। এ নিয়ে আগ্রহ জাগলেও পরিবার বা প্রিয়জনরা প্রথমেই বাধা দিয়ে থাকেন। তারা বাধাবিঘ্নের কথা বলে আগ্রহটুকু নষ্ট করে দেন।

বাংলাদেশে নারী ওয়েটার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। রেস্টুরেন্টে এই কাজটি যেন পুরুষকেই উইল করে দেওয়া। সেলস সেন্টার কিংবা ডেস্কে বসে কাজ সামলানোর কাজটাই তাদের দিয়ে হবে বলে ধারণা অনেকের। কিন্তু সেলস পয়েন্টে একজন বা দুজন কর্মী থাকলেও ওয়েটার কিন্তু দু-চারজন থাকেই। এতে কর্মসংস্থানের সংখ্যাও বাড়ে। অনেকের কাছে যদি মনে হয়ে থাকে নারী ওয়েটার নেই। এ নিয়ে এত মাথাব্যথার কী আছে? তাহলে এটিও একটি বড় কারণ। কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বেই।

সবশেষে আসা যাক, উদ্যোক্তাদের সংকট নিয়ে। নারী উদ্যোক্তা হতে গেলেও সম্পূর্ণ একা একা একটি উদ্যোগ শুরু করাটা কঠিন। তাই জীবনসঙ্গী বা পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে জোট বেঁধেই এই ব্যবসায় তাদের নামতে হয়। কারণটা বোঝা প্রয়োজন। একজন নারী যখন ঋণসুবিধা গ্রহণ করতে যাবে, তখন তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব দেখা দেয়। আর সেই কাগজগুলোর জন্যেও তাকে পুরুষের ওপর নির্ভর করতে হয় অনেকাংশে। নারীদের ঋণ দেওয়া নিয়ে বা সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এখন ব্যাংকগুলো এগিয়ে এলেও তা দেশের সবখানে সমানভাবে বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্যোগ শুরুর ক্ষেত্রে টাকা কিংবা পর্যাপ্ত রসদের অভাব তাদের উদ্যোগকে থামিয়ে রাখে।

রেস্টুরেন্ট ব্যবসা প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা। এই উদ্যোগের সম্ভাবনা অনেক ও এখনই সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে নারীরা এখানে যেন ছিন্নমূলের মতোই ভেসে বেড়াচ্ছে। এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বৃদ্ধির জন্যে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নাহলে নারীরা যেমন পিছিয়ে যাবে, তেমনই এই খাতে নতুন কিছুর আশাতেও গুড়েবালি।

অনন্যা/এআই