হাসির আড়ালে থেমে যাওয়া জীবন, মুন্সিগঞ্জে চিরঘুমে কারিনা কায়সার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছিলেন উচ্ছ্বাসের আরেক নাম। কখনও প্রাণখোলা হাসি, কখনও মজার ভিডিও, কখনও আবার জীবনের ছোট ছোট অনুভূতি- সব মিলিয়ে পরিচিত এক মুখ ছিলেন কারিনা কায়সার। সেই হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মেয়েটিকেই এবার বিদায় জানাতে হলো এক গভীর নীরবতায়।
সোমবার সকালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামে শেষবারের মতো একত্র হয়েছিল মানুষ। কেউ তাঁকে চিনতেন অভিনেত্রী হিসেবে, কেউ কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে, আবার এলাকার অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন ‘আমাদের কারিনা’। কিন্তু শেষযাত্রার আয়োজনটি ছিল একেবারেই অন্যরকম-নিঃশব্দ, সীমিত, শুধুই পরিবারের মানুষদের ঘিরে।
ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই তরুণ অভিনেত্রী। এরপর ঢাকায় শ্রদ্ধা নিবেদন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। তবে সেখানে ছিল না কোনো ক্যামেরার ঝলকানি, ছিল না লাইভ সম্প্রচার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোলাহল। পরিবার চেয়েছিল, জীবনের শেষ মুহূর্তটুকু যেন শুধুই আপনজনদের থাকে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামের মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। ভবেরচর বাসস্ট্যান্ডের পেছনের সেই গ্রামে মাইকিং করে জানানো হয়েছিল কারিনার শেষ জানাজার খবর। অনেকেই শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট- জানাজা ও দাফনের পুরো আয়োজন হবে ব্যক্তিগত পরিসরে। এমনকি মুঠোফোন নিয়েও কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়নি।

আজকের সময়ে, যেখানে মৃত্যুও অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘কনটেন্ট’ হয়ে ওঠে, সেখানে কারিনার পরিবার যেন ভিন্ন এক বার্তা দিল- সব শোক প্রকাশের জন্য ক্যামেরা প্রয়োজন হয় না। কিছু বিদায় নিঃশব্দেই সুন্দর। কারিনাকে দাফন করা হয়েছে তাঁর নানির বাগানবাড়ির আঙিনায়। যে জায়গায় হয়তো শৈশবের অনেক দুপুর কেটেছে, হাসি-খেলার স্মৃতি জমেছে, সেই পরিচিত মাটিতেই এখন তাঁর চিরনিদ্রা।
কারিনা কায়সার শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ছিলেন না। সাম্প্রতিক সময়ে অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখাতেও নিজেকে ব্যস্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর উপস্থাপনায় ছিল সহজাত প্রাণচাঞ্চল্য, যা খুব সহজেই দর্শকদের কাছে পৌঁছে যেত। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সংযোগটাও ছিল স্বাভাবিক ও আন্তরিক। তাই তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’-এর মতো কাজের মাধ্যমে অভিনয় ও লেখালেখির জগতেও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন তিনি। অনেকেই মনে করেন, তাঁর সামনে আরও দীর্ঘ পথ ছিল। আরও অনেক গল্প বলার ছিল। কিন্তু জীবন কখন কোথায় থেমে যাবে, সেই উত্তর কেউ জানে না।
কারিনার ছোট ভাই সাদাত হামিদ দাফনের পর গণমাধ্যমকে বলেন, পরিবার ইচ্ছা করেই প্রচার ও অতিরিক্ত লোকসমাগম থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে। কথাগুলোতে ছিল এক ধরনের ক্লান্তি, আবার একই সঙ্গে ছিল প্রিয় মানুষটিকে শান্তিতে বিদায় জানানোর আকুতি। কারিনা কায়সারের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাসিমুখের আড়ালেও একজন মানুষ থাকে- যার পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, ভালোবাসার মানুষ আছে। পর্দার মানুষদের আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু তাঁদের বিদায়ও যে কখনও এত নিঃশব্দ হতে পারে, সেটাই যেন নতুন করে অনুভব করল সবাই।
হয়তো অনেক দিন পরও তাঁর ভিডিওগুলো ভেসে উঠবে কারও নিউজফিডে। মানুষ আবারও দেখবে সেই চেনা হাসি। কিন্তু এবার সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকবে এক গভীর শূন্যতা।



